Advertisement
E-Paper

১৩ সেনার খুনিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের লাইভ সম্প্রচার করবে আমেরিকা! উঠছে ‘মধ্যযুগ’-তুলনা

২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর নিদাল হাসানকে আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দিতে চলেছে আমেরিকা। এক শতাব্দী পর আমেরিকায় প্রথম প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড লাইভ স্ট্রিম করার সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:২০
সাজাপ্রাপ্ত নিদাল হাসান।

সাজাপ্রাপ্ত নিদাল হাসান। ছবি: রয়টার্স।

মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকর করা হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য তা সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করা হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার এই কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে জানিয়েছেন। ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে ১৩ জন নিরস্ত্র মার্কিন সেনাকে গুলি করে খুন করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হাসানকে এই চরম সাজা দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের এক আধিকারিক বিবিসি-কে জানিয়েছেন, প্রায় এক শতাব্দী পর আমেরিকায় এটিই প্রথম প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড হতে চলেছে। মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব জানিয়েছেন, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুডেই এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। গত ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই আমেরিকার প্রথম সামরিক মৃত্যুদণ্ড।

রক্ষণশীল টিভি চ্যানেল ‘রিয়েল আমেরিকা’স ভয়েস’-এ হেগসেথ বলেন, “হাসানকে এক দল সেনার ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হতে হবে। আর এমনই হওয়া উচিত। এ ধরনের কাজের যে মারাত্মক পরিণতি হয়, তা মানুষের বোঝা দরকার।” হাসানের কোনও শেষ ইচ্ছা বা ট্রাম্পের কাছে আর্জির বিষয়ে তিনি সাফ বলেন, “পরোয়া করি না। ৩ ডিসেম্বর ওর সঙ্গে দেখা হচ্ছে।” সোমবার পেন্টাগনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষাসচিবের এই সুপারিশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমোদন দিয়েছেন।

কী ঘটেছিল ২০০৯ সালে?

মার্কিন সেনার মনোরোগ চিকিৎসক ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা হাসান ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডের এক জনবহুল মেডিক্যাল ভবনে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে গুলি করে মারেন। ২০১৩ সালের কোর্ট মার্শালে (সামরিক আদালত) তিনি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তানে মুসলিম এবং তালিবানদের রক্ষা করার জন্যই সে এই কাজ করেছিল।

হামলায় সাতটি গুলিবিদ্ধ হওয়া প্রাক্তন মার্কিন সেনা সার্জেন্ট অ্যালনজ়ো লান্সফোর্ড বিবিসি-কে বলেন, ফায়ারিং স্কোয়াডই এই অপরাধের “উপযুক্ত” সাজা। তবে তিনি মনে করেন না যে, সকলের জন্য এই লাইভস্ট্রিম উন্মুক্ত থাকা উচিত, কারণ যুবসমাজের কাছে এর ভুল বার্তা যেতে পারে। তবে নিহতের পরিবার এবং বেঁচে ফেরা মানুষদের সেন্সরবিহীন ভাবে এটি দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত। লান্সফোর্ড নিজে ওই দিন উপস্থিত থাকতে চান। তিনি বলেন, “গুলি চালানোর আগে আমি চাই ও আমার চোখের দিকে তাকাক। আমি চাই ও জানুক যে ও ব্যর্থ হয়েছে। আমি এখনও এখানেই আছি।”

সমালোচনা ও আইনি জটিলতা

এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট সেনেটর ক্রিস মার্ফি। তিনি একে ‘‘জঘন্য’’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি ইসলামিক স্টেট গ্রুপের (আইএসআই) মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইয়েল ল’ স্কুলের ভিজ়িটিং লেকচারার ইউজিন আর ফিদেল একে ‘‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত’’ বলে বর্ণনা করে বলেন, “মৃত্যুদণ্ড লাইভস্ট্রিম করার বিষয়টি পুরোপুরি মধ্যযুগীয়।”

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিল্‌স জানিয়েছেন, আধুনিক যুগে লাইভস্ট্রিম করার সিদ্ধান্ত “নজিরবিহীন” এবং এটি “অনিশ্চিত আইনি ক্ষেত্রে” দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, হাসানের আপিল প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। সে ফেডেরাল কোর্টে আবেদন করলে মৃত্যুদণ্ড স্থগিতও হয়ে যেতে পারে। মিল্‌সের দাবি, “লাইভস্ট্রিমের চেষ্টা আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ আকর্ষণের ফিকির। এটি আদৌ হবে বলে মনে হয় না।”

ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো জানিয়েছেন, আমেরিকায় এর আগে কখনও লাইভ স্ট্রিমে মৃত্যুদণ্ড দেখানো হয়নি। এর ফলে এক অভাবনীয় “স্বচ্ছতা" আসবে ঠিকই, তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নীতি এবং বয়সের বিধিনিষেধের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান কী বলে?

সামরিক আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পাশাপাশি উচ্চতর আদালতের পর্যালোচনারও প্রয়োজন হয়। এর আগে আমেরিকায় সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৬১ সালে। ১১ বছরের এক অস্ট্রিয়ান বালিকাকে ধর্ষণের দায়ে জন আর্থার বেনেট নামে এক মার্কিন সেনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজ়েনহাওয়ার এর অনুমোদন দিয়েছিলেন। এমনকি খোদ নিগৃহীতার পরিবার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে জনের প্রাণভিক্ষার আর্জি জানালেও তা নাকচ হয়। আর ফায়ারিং স্কোয়াডে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে এডি স্লোভিক নামে এক সেনা দলত্যাগীর।

‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৭টি দেশে ২,৭০০টিরও বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ইরান (১১টি) এবং আফগানিস্তান (৬টি) প্রকাশ্যে তা করেছে। গত বছর সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশের তালিকায় ছিল চিন, ইরান, সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং আমেরিকা। নিজের প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে ট্রাম্প প্রশাসন ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল। ফের ক্ষমতায় ফিরেই পূর্বসূরি জো বাইডেনের জারি করা ফেডেরাল মৃত্যুদণ্ডের স্থগিতাদেশ দ্রুত বাতিল করেছেন ট্রাম্প।

USA Death Penalty Pentagon Trump

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy