ব্রিটেনের গ্লস্টারশায়ারে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি ‘রয়্যাল এয়ার ফোর্স’ স্টেশন (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড থেকে তাদের সমস্ত বোমারু বিমান দেশে ফিরিয়ে নিল আমেরিকা। যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসদমন শাখার পুলিশ ওই ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার তদন্ত করছে। তার মাঝেই রবিবার পেন্টাগনের এক আধিকারিক বিবৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেছেন যে, ওই ঘাঁটি থেকে প্রায় এক ডজন ‘বি-১’ বোমারু বিমান আমেরিকার নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ওই বায়ুসেনা ঘাঁটির কাছে তিনটি “সন্দেহজনক গাড়ি” দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। ওই রাতেই ঘাঁটির দিকে যাওয়ার সময় প্রথম দফায় ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সি পাঁচ জন যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই পাঁচ জনই লন্ডনের বাসিন্দা। তাঁদের প্রথমে বিস্ফোরক সংক্রান্ত অপরাধ এবং পরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের প্রস্তুতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। যদিও পরে তাঁদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এর পর গত বৃহস্পতিবার লন্ডনে ২৫ বছর বয়সি এক ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিককেও সন্ত্রাসবাদী কাজের প্রস্তুতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার সন্ত্রাসদমন পুলিশ জানায়, ওই ষষ্ঠ ব্যক্তিকেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন একটি হুমকির জেরেই এই বোমারু বিমানগুলি সরানো হয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ দুই মার্কিন আধিকারিককে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে ইরানের মদতপুষ্ট নাশকতার ছক নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন মার্কিন কমান্ডারেরা। সপ্তাহ তিনেক আগেও হুমকি আসে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নির্দিষ্ট কিছু তথ্য সামনে আসতেই দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়। আমেরিকার পথে মাঝ-আকাশে বিমানগুলিতে জ্বালানি ভরার জন্য তড়িঘড়ি রিফুয়েলিং এয়ারক্র্যাফ্টও পাঠানো হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, এটি কোনও রাজনৈতিক নয়, বরং সামরিক স্তরে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। যদিও ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।
ইরান-যোগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের ঘটনার কয়েক দিন পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছিলেন, এই ঘটনায় ইরানের জড়িত থাকার “জোরালো ইঙ্গিত” রয়েছে। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তেহরান অবশ্য এই অভিযোগ দৃঢ় ভাবে অস্বীকার করেছে।
ষষ্ঠ ব্যক্তির গ্রেফতারির আগেই মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো ‘ফক্স নিউজ়’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এই ঘটনার পিছনে স্পষ্টতই “বিদেশি শক্তির হাত” রয়েছে।
অন্য দিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধৃত পাঁচ জনের জামিনে মুক্তির ঘটনায় “বিস্ময়” প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা ওদের সম্পর্কে সব জানি। আমরা হলে ওদের ছাড়তাম না।” পাশাপাশি তিনি এ-ও জানান যে, ব্রিটেন এ বিষয়ে আমেরিকার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করেছে।
ইরানের হুঁশিয়ারি
গত জুলাই মাসে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, “ইরানের ভূখণ্ডে আগ্রাসনের জন্য ব্যবহৃত যে কোনও ঘাঁটিকে আমাদের বাহিনী বৈধ লক্ষ্যবস্তু বলে মনে করবে।” ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রতিরক্ষা আধিকারিক এজ়রা কোহেন বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বিমান সরানোর এই সিদ্ধান্তকে “বিচক্ষণ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বি-১ বোমারু বিমান একটি কৌশলগত সম্পদ এবং সবরকম হুমকির হাত থেকে একে রক্ষা করার পদক্ষেপ আমরা করব।” কোহেন আরও জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইরানে হামলা চালানোর খরচ বেড়ে গেল, কারণ এখন সামরিক বিমানগুলিকে আমেরিকা বা ইউরোপের অন্য কোনও ঘাঁটি থেকে উড়তে হবে।
বি-১ বোমারু বিমানগুলি ‘বাঙ্কার ধ্বংসকারী’ বোমা এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত থাকে, যা ইরানের গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। লক্ষ্যবস্তুর দূরত্বের উপর ভিত্তি করে প্রতিটি মিশনে যাওয়া-আসা মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। পেন্টাগন অবশ্য জানিয়েছে, তাদের বোমারু বিমানগুলি মহাদেশীয় আমেরিকা থেকে উড়ে বিশ্বের “যে কোনও জায়গায়, যে কোনও সময়” অভিযান চালাতে প্রস্তুত। গত বছর ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর ক্ষেত্রেও ব্রিটেনের ঘাঁটি ছাড়াই আমেরিকা থেকে সরাসরি হামলা চালানো হয়েছিল।
ঠান্ডা যুদ্ধ এবং পরে ১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি মার্কিন বায়ুসেনার ‘স্ট্র্যাটেজিক এয়ার কমান্ড’ ব্যবহার করেছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল ইরানের উপর ব্যাপক হামলা চালানোর পর পশ্চিম এশিয়া জুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরানও ইজ়রায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলির উপর হামলা চালায়। ইরানের হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমানের যা ক্ষতি হয়েছিল, তা সামলে ওঠার চেষ্টার মধ্যেই এই বোমারু বিমানগুলি সরিয়ে নেওয়া হল। উল্লেখ্য, প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার মার্চ মাসে ইরানের উপর ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালানোর জন্য আমেরিকাকে আরএএফ ফেয়ারফোর্ড-সহ ব্রিটেনের অন্যান্য ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন।