E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

উর্বর প্লাবনভূমিতে চাষের আশায় বাঁচা

হাজারো প্রলোভন সত্ত্বেও নদীর পাড়ে বাড়ি করেননি তিনি। শুধু চাষ করতেন। মুরগির খামারও করেছিলেন। বাড়ি ছিল উঁচু জায়গায়।

কুন্তক চট্টোপাধ্যায় (কাঠমান্ডু)

শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০৩

—প্রতীকী চিত্র।

হড়পা বানে নেমে আসা পলিতে ঢাকা পড়েছে জনপদ। তার উপরেই ইতিউতি দেখা যাচ্ছে নতুন প্রাণের সঞ্চার! বন্যায় বাড়ি, গুদাম থেকে ভেসে আসা ভুট্টার দানা থেকেই মাথা তুলেছে বিঘত খানেক লম্বা চারাগাছ। ঠিক যেমন গাঙ্গেয় বঙ্গের গ্রামাঞ্চলে ধানের বীজতলা তৈরি হয়, তেমনই। তবে নেপালের বিধ্বস্ত এলাকার পলিভূমিতে মাথা তোলা ভুট্টার চারা কৃষকের মাপ মতো সাজানো নয়। এ দিক-সে দিক প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালেই সে বেড়ে উঠছে।

দেবীঘাটের অদূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওই চারাগাছই দেখাচ্ছিলেন বছর ষাটের বিষ্ণুমায়া চিত্রকর। হাজারো প্রলোভন সত্ত্বেও নদীর পাড়ে বাড়ি করেননি তিনি। শুধু চাষ করতেন। মুরগির খামারও করেছিলেন। বাড়ি ছিল উঁচু জায়গায়। কয়েকশো মিটার দূরে যখন বিপর্যয়ের পর শুধুই হাহাকার, তখন পিঠে ঝুড়ি বেঁধে কাঠ কুড়োতে যাওয়া বিষ্ণুমায়া বলছেন, ‘‘নদী থেকে দূরে ছিলাম বলেই স্বামী, তিন মেয়ে, এক ছেলে—কারও গায়ে আঁচড়ও লাগেনি।’’ তবে চাষের খেত পলি চাপা পড়ে গিয়েছে। মুরগির খামারেরও অস্তিত্ব নেই। যদিও বিষ্ণুমায়া হাসি মুখে বলছেন, ‘‘ওই দেখুন, ভেসে আসা ভুট্টা থেকে ক’দিনেই কেমন গাছ গজিয়েছে। আগামী বছর চাষ আরও ভাল হবে!’’

নে‌পালের হড়পা বান বিধ্বস্ত এলাকার বাসিন্দারাও বলছেন, বন্যার জেরে তৈরি হওয়া এই পলিবিধৌত জমিই আপাতত ভরসা। কারণ, ওই তল্লাটে নতুন করে রাস্তা, বাড়ি, বাজার তৈরি হওয়ার আশা আপাতত নেই। এই বিপদের পরে ফের নদীর বুকে বাসা তৈরি করবে, এমন বুকের পাটাও মানুষের নেই। তাই ওই জমি চাষবাসের কাজেই লাগবে। দেবীঘাট, ত্রিশূলী, গের্খুটারের পুরনো বাসিন্দারাও বলছিলেন, নদীর পাড়ে এই জায়গাগুলি এক সময় ভুট্টা, ধানের মতো ফসল চাষের কাজেই লাগত। মানুষজন থাকতেন উঁচু পাহাড়ের ঢালে। কারণ, এমন বড় মাপের বিপর্যয় না-হলেও পাহাড়ি নদীতে হড়পা বান বিরল ঘটনা নয়। নদী উপচে দু’পাড়ে পলি থিতিয়ে পড়াও ছিল পরিচিত ছবি। সেই পলির গুণে চাষবাস বরং আরও ভাল হত। নদীর পাড়ে চাষ এবং উঁচু জমিতে বাস—এই ছিল ওই এলাকার জীবনযাপনের ঐতিহ্য।

গত প্রায় দু’-আড়াই দশকে এই চাষের জমিগুলিতেই দোকান-বাজার, বাড়ি তৈরি হয়েছে। গাড়ি যাতায়াতের চওড়া রাস্তা হয়েছে। প্রকৃতির রোষে তছনছ হয়ে যাওয়ার পরে কারও কারও আক্ষেপ, কার্যত নদীর বুকের উপরে দোকানবাজার, বাড়ি না-করলে হয়তো এত ক্ষয়ক্ষতি হত না। চাষের জমিতে বসতি তৈরি হওয়ার কথার সায় উপগ্রহ-চিত্রেও মেলে। উপগ্রহ-চিত্র বিশ্লেষণ করে ভূগোলবিদেরা দেখেছেন, ত্রিশূলী, বেত্রবতী, দেবীঘাটের এলাকাগুলিতে গত সিকি শতকে নদীর পাড় ঘেঁষে চাষের জমিতে ক্রমশ বাড়িঘর তৈরি হয়েছিল। সে সবই শেষ হয়ে গিয়েছে।

নদী-বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের মতে, ‘‘নদী বলতে শুধু দু’পাড়ের মধ্যে থাকা জলের ধারাকে বোঝায় না। দু’পাড়ের নির্দিষ্ট এলাকা, যাকে প্লাবনভূমি বলা হয়, তা-ও নদীর অংশ। অতিরিক্ত পরিমাণে জল এলে সেই জল ওই জমিতে ছড়িয়ে দেওয়া নদীর প্রাকৃতিক ধর্ম।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, নদীর এই প্লাবনভূমিতেই বসতি, বাজার তৈরি হয়েছিল। নেপালের হড়পা বানে এই অংশেই সব ধ্বংস করে পলির স্তর পড়েছে। বন্যার ব্যাপারে পুরনো বাসিন্দাদের যে ধারণা, তা-ও প্রকৃতি থেকে আহৃত জ্ঞান বলে মনে করেন নদী-বিশেষজ্ঞেরা। আমেরিকার একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছিল, প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বন্যা বা বার্ষিক বন্যা হয়। ১৮ বছর পর বার্ষিক বন্যার দ্বিগুণ মাত্রার বন্যা হয়। একশো বছরে একটি বিধ্বংসী বন্যা হয়।

কল্যাণ রুদ্র বলছেন, ‘‘উষ্ণায়ন, অতিবৃষ্টির জেরে বন্যার এই হিসাব বদলেছে। বিধ্বংসী বন্যা এখন আরও কম সময় অন্তর হচ্ছে।’’ তবে বিপর্যস্ত এলাকার পলির চরে চাষবাস নিয়ে বলছেন, ‘‘এই পুরনো নিয়মেই ফিরতে হবে। তবে নদীর উজানে বড়-বড় পাথরের চাঁই, নুড়ি থাকায় সেখানে চাষ হবে না। নদীর জলের গতি যেখানে কম, জমি তুলনামূলক সমান সেখানেই নরম পলি পড়ে। সেই এলাকাগুলিতেই চাষ হবে। কোথাও কোথাও হয়তো জমির চরিত্র অনুযায়ী ফসলের ধরনও বদল হতে পারে।’’

যে ফসলই ফলুক, আপাতত বিপর্যয় বয়ে আনা পলির উর্বরতাই বাঁচার আশা ‘সর্বহারা’ চাষার!


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nepal flood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy