সাধক কমলাকান্ত চক্রবর্তী তার শ্য়ামা সঙ্গীতে লিখেছেন, 'কালোরূপে দিগম্বরী হৃদিপদ্ম করে আলো রে...', সাধক রামপ্রসাদ বলছেন, 'মন রে কৃষি কাজ জানো না, এমন মানব জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।' আবার নজরুল লিখেছেন, 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।' আসলে কালীই প্রকৃতি, তিনিই পরমব্রহ্ম। কিন্তু ২০২৬ সালেও স্বয়ং কালীর রূপ নিয়েই আলোচনার অন্ত নেই। সমাজমাধ্য়ম থেকে শুরু করে সাধারন মানুষের মুখে মুখে ফাটাকেষ্টর কালী।
উত্তর কলকাতার কালীপুজো মানেই ফাটাকেষ্টর মা কালী। শ্য়ামবর্ণা দীর্ঘাঙ্গী এলোকেশী প্রতিমা, বড় চোখ আর রাজ-রাজেশ্বরী সাজ। এই রূপের সঙ্গে বহু বছর ধরে জড়িয়ে রয়েছে তিলোত্তমার আবেগ। কিন্তু গত বছর থেকেই উত্তর কলকাতার এই ঐত্য়িহ্য়বাহী পুজোর প্রতিমা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা চর্চা। দীর্ঘদিনের চেনা ফাটাকেষ্টর কালী প্রতিমার শিল্পী বদলের খবর সামনে আসতেই শুরু হয়েছে আলোচনা। এবছরেও ফাটাকেষ্টর কালী নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। সমাজমাধ্যমেও ফিরে ফিরে আসছে পুরনো প্রতিমার ছবি। পুরনো প্রতিমার স্মৃতিচারণ করছেন ফাটাকেষ্টর কালীর ভক্তরা। কানাঘুষো চলছে একটাই প্রশ্ন, মাধব পালের হাতের সেই চেনা রূপ কি আর ফিরবে না?
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে ফাটাকেষ্টর কালীপ্রতিমা তৈরি করেছেন শিল্পী মাধব পাল। বলা ভাল, মায়ের এই অপূর্ব রূপের মূল সৃষ্টিকর্তা ভাস্কর কালী পাল। শিল্পী মাধব পাল তারই সুযোগ্য় পুত্র। ভাস্কর কালী পালের আদলেই দীর্ঘদিন ধরে কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্টর কালী প্রতিমার তৈরি করতেন মাধব পাল। তাঁর গড়া প্রতিমার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন বহু দর্শনার্থী ও ভক্ত। ফলে প্রতিমার শিল্পী বদলে বার বার প্রশ্ন উঠেছে পুজোর ঐতিহ্য ও পরিচিতি নিয়েও। ২০২৫ সালে মাধব পালের পরিবর্তে প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্ব পান শিল্পী মিন্টু পাল। গতবছরই পুজোর উদ্য়োক্তারা জানিয়েছিলেন, 'নতুন শিল্পীকে দিয়ে কাজ করানোর ইচ্ছা থেকেই এই পরিবর্তন; কোনও দ্বন্দ্ব বা বিভেদের বিষয় ছিল না।'
ছবি: সংগৃহীত
এবারও ফাটাকেষ্টর কালী তৈরির দায়িত্ব পেয়েছেন শিল্পী মিন্টু পাল। আগের থেকে বেড়েছে মূর্তির উচ্চতাও। দীর্ঘদিন ১৪ ফুটের প্রতিমা তৈরি হত। বর্তমানে মূর্তির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। মুকুট নিয়ে তা প্রায় ১৭ ফুটের কাছাকাছি। আসলে, ফাটাকেষ্টর কালী ছিল তিলোত্তমার অহঙ্কার। শুধু ভক্তি নয়, কলকাতার এই পুজোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপত্তিও ছিল দেখার মত। তৎকালীন নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে বাঙালির ম্য়াটিনি আইডল উত্তম কুমার, বিগ বি অমিতাভ বচ্চন, কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে কে আসেননি এই পুজোতে। রাজনীতি থেকে অন্ধকার দুনিয়া… সব ক্ষেত্রেই কলকাতার সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের ডন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্টর প্রভাব কতটা ছিল তা একটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়। আজ সেই ফাটাকেষ্টর কালী নিয়েই আলোচনার অন্ত নেই। নেপথ্য়ে মা কালীর পরিচিত রূপের বদল।
আরও পড়ুন:
আসলে, সমাজমাধ্যমের আলোচনার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে সমস্ত বিতর্কের উত্তর। মানুষ শুধু একটি প্রতিমাকে মনে রাখেন না, মনে রাখেন সেই প্রতিমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়, অভিজ্ঞতা আর আবেগকেও। ফাটাকেষ্টর কালীপুজোর ইতিহাসে কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্টর নাম যেমন জড়িয়ে রয়েছে, তেমনই প্রতিমার রূপ নির্মাণে শিল্পীদের ভূমিকাও এই পুজোর স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের সঙ্গে পুজোর আয়োজন বদলাবে, শিল্পীর হাত বদলাবে, প্রতিমার রূপেও আসবে নতুনত্ব। কিন্তু পুরোনো শিল্পীর অবদান কি তাতে মুছে যায়?
ফাটাকেষ্টর কালীর জৌলুস কমেছে বলে অনেকেরই দাবী, তবে, আজও মায়ের নামে ভক্তিতে ভাটা পড়েনি। প্রতিবছরই বহু দর্শনার্থী, ভক্ত দলে দলে আসেন ফাটাকেষ্টর কালী দেখতে। প্রার্থনা করেন, মানত করেন। কলকাতার বারোয়ারী পুজোর মানচিত্রে আবেগের অপর নাম ফাটাকেষ্টর কালী। মাতৃ প্রতিমার রূপ নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন, আলোচনা, বিতর্ক, পাল্টা বিতর্ক। তবে, ভক্তিতে ভাঁটা পড়েনি আজও। শিল্পী বদলে দেবীর রূপের কিছু পার্থক্য আসতে পারে, কিন্তু সেই স্মৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এত সহজে বদলায় কি?
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।