টাটা সন্সে পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিল গোষ্ঠীটিতে ৬৬ শতাংশ মালিকানা থাকা টাটা ট্রাস্টস। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে টাটা সন্সের শেয়ারবাজারে নথিভুক্তি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার জন্য সম্প্রতি চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল ব্যবসায়িক গোষ্ঠীটিকে।
এই প্রস্তাবে গোষ্ঠীটির দু’টি সংস্থা— টাটা ইলেকট্রনিক্স সিস্টেমস সলিউশনস প্রাইভেট লিমিটেড (টিইএসএস) এবং টাটা কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স (টিসিই)-কে টাটা সন্স প্রাইভেট লিমিটেড (টিএসপিএল)-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ট্রাস্টগুলি টাটা সন্সের বোর্ডকে এই প্রস্তাবটি বিবেচনা করতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার অনুরোধ করেছে, যার মধ্যে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কাছ থেকে ‘নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি)’ বা অনাপত্তি শংসাপত্র সংগ্রহের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা। নোয়েলদের প্রস্তাব— গোষ্ঠীভুক্ত টিইএসএস এবং টিসিই-কে হোল্ডিং সংস্থা টাটা সন্সে মেশানো হলে এতে হোল্ডিং হওয়ার পাশাপাশি টাটা সন্স ব্যবসায়িক সংস্থা (অপারেটিং কোম্পানি) হিসেবেও গণ্য হবে। টাটা ট্রাস্টের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে টাটা সন্স কেবল টাটা গোষ্ঠীর হোল্ডিং সংস্থা হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে গোষ্ঠীটিক মূল বা অভিভাবক সংস্থা হিসেবে ভূমিকার পাশাপাশি নিজেও উল্লেখযোগ্য পরিচালন ব্যবসা ও আয়ের উৎস গড়ে তুলতে পারবে। টাটা ট্রাস্টসের মতে, এর ফলে পুনর্গঠিত সংস্থাটি আর ‘নন-ব্যাঙ্কিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানি (এনবিএফসি)’ বা ‘কোর ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (সিআইসি)’, কোনওটিরই শর্তাবলি পূরণ করবে না।
বিবৃতিতে টাটা ট্রাস্টস জানিয়েছে, ‘‘টাটা সন্স প্রাইভেট লিমিটেডের ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক হিসেবে টাটা ট্রাস্টস ব্যবসায়িক গোষ্ঠীটির জন্য একটি কৌশলগত পুনর্গঠন পরিকল্পনা করেছে। এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে পুনর্গঠিত প্রতিষ্ঠানটি ‘নন-ব্যাঙ্কিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি (এনবিএফসি)’ বা ‘কোর ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (সিআইসি)’, কোনওটিরই আওতাভুক্ত হবে না। ফলে থাকবে না নথিভুক্তির বাধ্যবাধকতাও।’’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘‘টাটা ট্রাস্টসের বিশ্বাস, প্রস্তাবিত পুনর্গঠন এবং নিয়মকানুন মেনে চলার কর্মপরিকল্পনাটি টাটা গোষ্ঠী এবং এর অংশীদারদের জন্য সর্বোত্তম হবে। পাশাপাশি, এটি একটি সিআইসি-র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম মেনে চলা একটি বৈধ পদ্ধতিও হবে। সেই অনুযায়ী, টিএসপিএল বোর্ডকে এই প্রস্তাব বিবেচনা ও অনুমোদন করার জন্য এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার জন্য চিঠি পাঠিয়েছে টাটা ট্রাস্টস। এর মধ্যে রয়েছে টিএসপিএল-এর প্রস্তাবিত একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় এনওসি চেয়ে আরবিআইয়ের কাছে আবেদন করা। টাটা ট্রাস্টস এবং টিএসপিএল যৌথ ভাবে প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের সমস্ত বিষয়ে আরবিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা এবং যোগাযোগ বজায় রাখবে।’’
প্রস্তাবিত কাঠামোটি এমন একটি সাংগঠনিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা টাটা সন্স তার দীর্ঘ ইতিহাসে বহু দিন ধরে অনুসরণ করেছে। টাটা ট্রাস্টস জানিয়েছে, টাটা সন্সের ১০০ বছরের অস্তিত্বের মধ্যে প্রায় ৮০ বছর ধরেই এর নিজস্ব পরিচালন ব্যবসা এবং পরিচালন আয় ছিল, যা গোষ্ঠীর অন্যান্য ব্যবসা এবং উদ্যোগের অর্থায়নে সহায়তা করত। এর একটি উদাহরণ হল টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস)। ২০০৪ সালের আগে পর্যন্ত টিসিএস ছিল টিএসপিএলের একটি ব্যবসায়িক ভাগ। পরে এটিকে একটি পৃথক সহযোগী সংস্থায় পরিণত করা হয়। টিএসপিএলের অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা ছিল। সেই অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ফলে টিএসপিএল তার আগের পরিচালন কাঠামোয় ফিরে যাবে। অর্থাৎ, টাটা গোষ্ঠীর একটি হোল্ডিং সংস্থা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এর নিজস্ব ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও আয়ের উৎসও থাকবে। ট্রাস্টগুলির মতে, এই পদক্ষেপটি আরবিআইয়ের সেই আগের শ্রেণিবিন্যাসের (২০০৪-পরবর্তী সময়কালের) সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, যেখানে টিএসপিএলকে একটি ‘নন-ব্যাঙ্কিং, নন-ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
সম্প্রতি ব্যবসা পরিচালনার দিক থেকে টাটা সন্স এবং টাটা ট্রাস্টসের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকট হয়েছে। হোল্ডিং সংস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং টাটা সন্স শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত (লিস্টেড) হবে কি না, তা নিয়েও সংস্থার বোর্ড দ্বিধাবিভক্ত। সেই আবহেই টাটা সন্সকে এ বার পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিল টাটা ট্রাস্ট।