Advertisement
E-Paper

অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ করে সাফল্য, এক পরিবারে ৫ জন চিকিৎসক হওয়ার পথে! অপেক্ষায় আরও ২

এক জনের আয়ে ৯ জনের খরচ কী ভাবেই বা চলে। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা হত প্রায়ই। অভাবের সংসারে সন্তানেরা তাই খুব অল্প বয়সেই বুঝেছিল, পড়াশোনা করে স্বনির্ভর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। আধপেটা খেলেও পড়াশোনা বন্ধ করেনি।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৩৮

ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।

মাটির দেওয়ালে অ্যাসবেসটসের ছাদ। তার নীচে সন্তানসন্ততি নিয়ে সংসার ৭৬ বছরের ব্রুশি নায়াক আর ৬২-র অনুশায়ার। দু’জনের কেউ প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডীও পেরোননি। তবে তাদের ৫ সন্তান এখন চিকিৎসক হওয়ার পথে। এ বছরই নিট ইউজি উত্তীর্ণ হয়েছেন তিন কন্যা।

ব্রুশি পরিযায়ী শ্রমিক। কাজ না পেলে বাড়ির সামনের একটুকরো জমিতে আদা, হলুদ ইত্যাদি ফলান। ওড়িশার দারিংবাড়ির এক পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা গ্রাম সিকাবাড়িতে তার বাস। সেখানেই সাত ছেলেমেয়েকে নিয়ে তার সংসার। বছর কয়েক আগে পর্যন্ত সে সংসারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনকারী। কিন্তু এক জনের আয়ে ৯ জনের খরচ কী ভাবেই বা চলে। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা হত প্রায়ই। হয়তো গোটা একটা বেলা হাঁড়িই চড়ল না। না খেয়েই থাকল ছেলেমেয়েরা। অভাবের সংসারে তারা তাই খুব অল্প বয়সেই বুঝেছিল পড়াশোনা করে স্বনির্ভর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। ফলে আধপেটা খেলেও পড়াশোনা বন্ধ করেনি।

বড় ছেলে বিভীষণ নায়কই প্রথম স্কুল পেরিয়ে বড় পরীক্ষায় বসেন। নিট ইউজি উত্তীর্ণ হন। ভর্তি হন কোরাপুটের শহিদ লক্ষ্মণ নায়ক মেডিক্যাল কলেজে। বছর ২৫-এর সেই তরুণ এখন এমবিবিএস সম্পূর্ণ করে ওই কলেজেরই শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। ব্রুশির পরিবারে বিভীষণই প্রথম যাঁর নামের আগে এখন ‘ডাক্তার’ লেখা হয়।

বিভীষণের দু’বছরের ছোট বোন মোনালিসা নিট ইউজি পাশ করেন বছর তিনেক আগে। তার জন্য কোনও বিশেষ প্রশিক্ষণ সংস্থায় পড়াশোনা করেননি মোনালিসা। সেই সামর্থ্যও ছিল না। দাদার কাছে পড়েই নিট ইউজি-র প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বিভীষণ বলেছেন, ‘‘আমি নিজে যে ভাবে পড়াশোনা করেছি, সে ভাবেই শিখিয়েছিলাম ওকে। দেখলাম সহজেই পারছে। এক বারের চেষ্টাতেই নিট পাস করছিল ও।’’

মোনালিসা এখন এমবিবিএসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। দাদার কলেজেই পড়ছে সে। তবে তাঁর সাফল্যে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বিভীষণের। পরের তিন বোন— ২০ বছরের সুনেমি, ১৮ বছরের আশ্রিয়া এবং ১৯ বছরের মীনাক্ষিকেও নিট-এর জন্য প্রস্তুত করেছেন তিনিই। কলেজ থেকে বাড়িতে এসে পড়ানো সম্ভব নয় বলে বোনেদের ব্রহ্মপুরে এনে রেখেছিলেন। সেই চেষ্টার ফল মিলেছে। চলতি বছরে নিট উত্তীর্ণ হয়ে আপাতত এমবিবিএস কলেজের ছাত্রী তিন জনই।

এই তিন জনের মধ্যে সুনেমি যদিও বিভীষণের আপন বোন নন। কাকার মেয়ে। তবে সুনেমি তাঁর জেঠতুতো ভাই-বোনের সঙ্গে মানুষ হয়েছেন জেঠা ব্রুশির সংসারেই। বাকিদের সঙ্গে জেঠতুতো দাদা তাকেও দিয়েছেন নিট উত্তীর্ণ হওয়ার প্রয়োজনীয় পাঠ। আপাতত পুরীর মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা শুরু হয়েছে তাঁর। আশ্রিয়া আর মীনাক্ষি ভর্তি হয়েছেন যথাক্রমে বোলাঙ্গির এবং ভবানীপাটনার মেডিক্যাল কলেজে।

কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার পড়াশোনার খরচ তো কম নয়। অনটনের সংসারে ওই অর্থের জোগান এল কোথা থেকে। উত্তর দিয়েছেন ব্রুশি। বলেছেন, ‘‘আমি সত্যিই জানি না, কী ভাবে এই সাফল্য পেল ওরা। ছেলেমেয়েদের মানুষ করার সময় আমার একমাত্র চিন্তা ছিল, ওদের পড়াশোনার খরচ চালাব কী ভাবে? পড়াশোনা করাব বললেই তো হবে না, পড়াশোনার খরচ তো প্রচুর।’’ বিভীষণ জানিয়েছেন, বাবা খুব সামান্যই অর্থসাহায্য করতে পেরেছিলেন। দরিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারীদের জন্য সরকারি যে সমস্ত প্রকল্প থাকে তার থেকে কিছু অর্থ সাহায্য পেয়েছিলেন বোনেরা। বাকি খরচ জোগানোর জন্য ৬ লক্ষ টাকার ঋণ নিয়েছিলেন বিভীষণ নিজে।

হবু পাঁচ চিকিৎসকের জননী অনুসায়া নিজে স্কুলে যাননি। অক্ষরজ্ঞানটুকুও নেই তাঁর। তবে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার গুরুত্ব তিনি বোঝেন। জানেন শিক্ষাই সেই আলো, যা দারিদ্রের অন্ধকার থেকে টেনে তুলবে তাঁদের পরিবারকে। সন্তানদের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে একগাল হেসে তাঁদের মা জানিয়েছেন, ‘‘আমি হয়তো ওদের পড়াতে পারিনি, কিন্তু আমার কাজ ছিল ওদের শৃঙ্খলা শেখানো, ওদের খাইয়ে-পরিয়ে বড় করা। ওদের দেখে বুঝি সেটুকু করতে পেরেছি।’’

অনুসায়ার আরও দুই পুত্রসন্তান এখন স্কুলে। ব্রুশি আর তাঁর ইচ্ছে, তারাও বড় হয়ে দাদা-দিদিদের মতোই চিকিৎসক হোক। সেই চেষ্টাও শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। অগ্রজদের বিশ্বাস সেই দিন দূরে নয়, যখন বাবা-মা গর্ব করে বলতে পারবেন, তাঁদের সাত সন্তানই চিকিৎসক।

NEET UG NEET doctor Inspirational story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy