স্নাতকোত্তর মেডিক্যাল কোর্সে ভর্তির প্রক্রিয়ায় বড়সড় পরিবর্তনের সুপারিশ করল ১২ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি। নিট-পিজি এবং নিট-এসএস পরীক্ষায় প্রচলিত পার্সেন্টাইল-ভিত্তিক যোগ্যতামানের পরিবর্তে র্যাঙ্কের ভিত্তিতে মেধাতালিকা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।
৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা পড়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পার্সেন্টাইলের যোগ্যতামান পূরণের পরিবর্তে পরীক্ষায় প্রাপ্ত র্যাঙ্কের ভিত্তিতে ভর্তির জন্য প্রার্থীদের বিবেচনা করা হবে।
ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (এনএমসি) প্রস্তাবটিতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে নতুন পদ্ধতি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত নিয়ম, যোগ্যতার শর্ত এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞ কমিটির অন্যান্য সুপারিশ কী?
১। নন-ক্লিনিক্যাল স্নাতকোত্তর কোর্সের ফি কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
২। প্রি-ক্লিনিক্যাল ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়ে পড়াশোনা করা পড়ুয়াদের সার্ভিস বন্ড থেকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
৩। কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় যাতে দেরি না হয় তার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৪। স্নাতকোত্তর মেডিক্যালের ফাঁকা আসন সংখ্যা কী কী উপায়ে কমানো যায় তা খোঁজার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কমিটির রিপোর্টের উপর নিজেদের বক্তব্য জানানোর জন্য আবেদনকারীদের সময় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
কেন নিট-পিজি-র যোগ্যতামান নিয়ে বিতর্ক?
নিট-পিজি-তে একাধিকবার যোগ্যতামানের পার্সেন্টাইল কমিয়ে দেওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মূলত স্নাতকোত্তর মেডিক্যালের বহু আসন ফাঁকা থেকে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালে সমস্ত শ্রেণির প্রার্থীদের জন্য যোগ্যতামান কমিয়ে শূন্য পার্সেন্টাইল করা হয়। এর ফলে ঋণাত্মক নম্বর পাওয়া প্রার্থীরাও কাউন্সেলিংয়ে অংশ নেওয়ার যোগ্য হয়েছিলেন।
২০২৪ সালের নিট-পিজি ভর্তি প্রক্রিয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ ও আর্থিক ভাবে দুর্বল শ্রেণির প্রার্থীদের যোগ্যতামান ১৫তম পার্সেন্টাইল এবং সংরক্ষিত শ্রেণির প্রার্থীদের ১০ম পার্সেন্টাইলে নামিয়ে আনা হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা আরও কমানো হয়েছিল।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়াতেও একই সমস্যা দেখা দেয়। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি ন্যাশনাল বোর্ড অফ এক্সামিনেশনস ইন মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এনবিইএমএস) নিট-পিজি কাউন্সেলিংয়ের তৃতীয় পর্বের জন্য ফের যোগ্যতামান কমানোর কথা ঘোষণা করে।
নতুন নিয়মে—
সাধারণ ও আর্থিক ভাবে দুর্বল শ্রেণির প্রার্থীদের যোগ্যতামান ৫০ থেকে কমিয়ে ৭ পার্সেন্টাইল করা হয়।
সাধারণ শ্রেণির বিশেষ ভাবে সক্ষম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে কমিয়ে ৫ পার্সেন্টাইল করা হয়।
তফসিলি জাতি, উপজাতি ওবিসি প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে কমিয়ে শূন্য পার্সেন্টাইল করা হয়।
এর ফলে ঋণাত্মক নম্বর পাওয়া প্রার্থীরাও কাউন্সেলিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যোগ্যতামান কমানোর পর অতিরিক্ত ৯৫ হাজার ৯১৩ জন প্রার্থী কাউন্সেলিংয়ের জন্য যোগ্য হয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়। আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, বারবার যোগ্যতামান কমালে স্নাতকোত্তর মেডিক্যাল শিক্ষার মান প্রভাবিত হতে পারে।
স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্টের
২০২৬ সালের মে মাসে নিট-পিজি-র যোগ্যতামান বারবার কমানোর সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরির কথা বলে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি পিএস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে, প্রতি বছর ভর্তি প্রক্রিয়ায় এই সমস্যা দেখা দেওয়ায় এক দিকে প্রার্থীরা সমস্যায় পড়ছেন, অন্য দিকে বহু আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে।
যোগ্যতামান কমানোর ফলে মেডিক্যাল শিক্ষার মানের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল আদালত। ২০২৬ সালের অগস্টে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টকে জানায়, এই সমস্যা খতিয়ে দেখতে ১২ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৩ জুলাই, ২০২৬ তারিখে গঠিত এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্বাস্থ্য পরিষেবার ডিরেক্টর জেনারেল।
প্রচলিত ভর্তি পদ্ধতির খামতি চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ করাই ছিল কমিটির দায়িত্ব। সেই রিপোর্টেই ২০২৭ সাল থেকে র্যাঙ্ক-ভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এই মুহূর্তে প্রস্তাবগুলি চূড়ান্ত নয়। নতুন নিয়ম কবে এবং কী ভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত বিধি এবং সুপ্রিম কোর্টে পরবর্তী শুনানির উপর।