‘মাথায় তার জটা আছে, পেটে ভরা জল/ ঝড়-তুফানেও নড়ে না সে, এমন এক ফল...’
ভারতের উষ্ণ-আর্দ্র, ক্রান্তীয় উপকূলীয় এলাকায় নারকেল গাছের প্রাচুর্য রয়েছে। এ দেশে নারকেলকে শ্রী-সমৃদ্ধির প্রতীক হিসাব গণ্য করা হয়। পশ্চিমবঙ্গেও নারকেলের কদর ঘরে ঘরে। উৎসবে পার্বনে এক সময় নারকেল নাড়ু, ছাপা সন্দেশেই ছিল আতিথেয়তার অঙ্গ। মোচার ঘণ্ট বা ছোলার ডালে নারকেল কোড়ানো বা মুড়ির সঙ্গে নারকেল কুচির স্বাদ বাঙালিকে মাতিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর।
কিন্তু সেই নারকেলের উৎপাদনই কমছে। মা-ঠাকুমার হাতের তৈরি নারকেল নাড়ুর স্মৃতি অবশ্য ফিকে হয়ে আসছে ক্রমশই। মরসুম ছাড়াই ডাবের দাম গড়ে ৬০ টাকা। এই প্রবণতা চলতে থাকলে কয়েক বছর পরে এই তা ১৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞেরা। আসলে ফলন কমছে নারকেলের।
সারা দেশে সব থেকে বেশি নারকেল হয় কেরলে। তার পর অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যও রয়েছে। কেন্দ্রের তরফে পশ্চিমবঙ্গে ‘কোকো ভিলেজ’ অর্থাৎ ‘নারকেল গ্রাম’ তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, এমনই জানা গিয়েছে। আগামী ২ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব নারকেল দিবস। সেই উপলক্ষে নারকেল চাষ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারকেল থেকে নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনের বিষয়ে সচেতনতা প্রসারে উদ্যোগী হচ্ছে কেন্দ্র। অনুষ্ঠানটি হবে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনে নারকেল উন্নয়ন পর্ষদ রাজ্য কেন্দ্র, কলকাতার উন্নয়ন আধিকারিক শ্রীতমা বিশ্বাস জানান, বর্তমানে রাজ্যের প্রায় ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে নারকেল গাছ রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বর্ষে প্রায় ৪২ কোটি নারকেল উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু এ রাজ্যে যা চাহিদা, তার তুলনায় এই ফলন অপ্রতুল। সে কারণে ২০২৬-২৭ আর্থিক বর্ষে এ রাজ্যে আরও ২০০ হেক্টর জমিতে নারকেল গাছ বসানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইতিমধ্যে সেই কাজও শুরু হয়েছে। বিশ্ব নারকেল দিবসে সেই সচতেনতা আরও বৃদ্ধি করতে নারকেলের নানা সুস্বাদু খাবার ও জিনিস তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। নারকেল থেকে তৈরি তেল, সাবান, ঘর সাজানোর জিনিস ও মিষ্টি, সুস্বাদু খাবারের ডালি নিয়ে নদিয়ার মোহনপুরের বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিশ্ব নারকেল দিবস’ পালন করা হবে। রাজ্যের খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যানপালন দফতরের মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তীও থাকবেন ওই অনুষ্ঠানে। নারকেল দিবসে এ বছরের থিম, ‘অনিশ্চয়তার সময়ে নারকেল: খাদ্য, শক্তি এবং জীবিকার সুরক্ষা।’
নারকেল গাছের সব অংশই কোনও না কোনও কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই একে কল্পবৃক্ষ বলা হয়। চাকরির বাজার ক্রমশ সংকুটিত হয়ে পড়ার সময়েও কী ভাবে শুধু নারকেল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করা যায় সেই পাঠও দেওয়া হবে ওই অনুষ্ঠানে। পাশাপাশি চাষের জিনিস কী ভাবে বাজারজাত করা যায় সেটাও দেখানো হবে বলে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
পেশার ক্ষেত্রেও এই নারকেল চাষ লাভজনক। সাধারণ মানুষকে তা বোঝানোর চেষ্টা করবেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে যে কোনও সাধারণ মানুষ একটি নারকেলের চারা কিনতে পারেন ১০০ টাকার বিনিময়ে। পরবর্তি দু’বছরে ১৭৫ টাকা করে ভর্তুকি দেওয়া হয়। হেক্টর পিছু দু’বছরের ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দও করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। পেশার দিক থেকেও এই নারকেল চাষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এক একর জমিতে ৭০টি নারকেল গাছ বসালে ৬-৭ বছর পর বছরে ১.৫ থেকে ২ লক্ষ টাকা আয় হতে পারে। পাশাপাশি নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ঘর সাজানোর নানা জিনিস তৈরি করা যায়। নারকেলের মিষ্টি, সাবান, আইসক্রিম তৈরিও লাভ জনক। ওই অনুষ্ঠানে সেগুলির প্রদর্শনীর পাশাপাশি প্রশিক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হবে।
নারকেল উন্নয়ন পর্ষদ সূত্রের খবর, নারকেল গাছ সব থেকে বেশি রয়েছে মুর্শিদাবাদে। প্রায় ছ’হাজার হেক্টর জমিতে রয়েছে নারকেল গাছ। এর পরই রয়েছে দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর এবং হাওড়া। এর পরে মালদহ, বীরভূম, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া এই জেলাগুলিতেও কোকো ভিলেজ এর মাধ্যমে নারকেল চাষের ক্ষেত্র প্রসারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
শ্রীতমা বলেন, ‘‘নারকেল চাষ খুবই লাভজনক কারণ বছরের প্রায় সব সময়েই কম বেশি ফলন হয়, মরসুমি নয়। গাছ বসানোর পরে সাময়িক ভাবে ৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়। তার পরে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ বছর ফলন দেয়। চাহিদাও বাড়ছে, তাই ফলন বৃদ্ধির উপরে জোর দেওয়া হয়েছে।’’