বদলাতে চলেছে স্কুলপাঠ্য বইয়ের বিষয়বস্তু। রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’-র বদলে এ বার পড়ানো হতে পারে ‘শিবাজী উৎসব’। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকের পরিবর্তে পাঠ্যক্রমে আসতে পারে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের ‘বঙ্গের প্রতাপাদিত্য’। স্কুলশিক্ষা দফতরকে এমনই সুপারিশ করতে চলেছে রাজ্যের সিলেবাস কাম কারিকুলাম কমিটি।
গত মে মাসে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরই স্কুলপাঠ্য বিষয়ে পরিবর্তন আসবে বলে নানা স্তরে আলোচনা চলছিল। সব থেকে বেশি আলোচনা হয়েছে সিঙ্গুর আন্দোলন এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। এ বার জানা গিয়েছে, স্কুলপাঠ্য থেকে সিঙ্গুর আন্দোলন বাদ দিয়ে, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু অংশ যুক্ত করা হবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও শিক্ষাবিদ হিসাবে তাঁর অবদানের প্রসঙ্গ যেমন থাকবে পাঠ্যপুস্তকে। তেমনই থাকতে পারে তাঁর তারকেশ্বরের সভা এবং কাশ্মীরযাত্রার অংশও। রাজ্যের সিলেবাস কাম কারিকুলাম কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান সংক্রান্ত সুষ্পষ্ট তথ্যও যুক্ত করা হবে পাঠ্যে।
গত এক দশকে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে সিঙ্গুর আন্দোলন যুক্ত হয়েছে। বিধানসভা ভোটে জিতে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই তা বাদ দেওয়ার দাবি উঠতে শুরু করে। এরই পাশাপাশি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান পাঠ্যে অন্তর্ভুক্ত করানো নিয়ে শিক্ষামহলে চর্চা শুরু হয়। সরকারি শীর্ষ স্তরেও এ বিষয়ে সমর্থনসূচক মতামত শোনা গিয়েছিল।
গত মাসেই প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমের পর্যালোচনার জন্য গঠন করা হয় ‘সিলেবাস কাম কারিকুলাম কমিটি’। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় ২৪ জুলাই। এর পর ৪ অগস্ট পাঠ্যক্রম কমিটির প্রথম বৈঠক হয় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অফিসে। সেখানে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানান, ২০২৭ সালের জন্য পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের সুযোগ কম। কারণ হাতে বেশি সময় নেই। কিন্তু ২০২৮ সাল থেকে পাঠ্যক্রমে আমূল পরিবর্তন হবে। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে রাজ্যের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের পড়ুয়ারা যেন প্রথম সারিতে থাকতে পারে, সে কথা মাথায় রেখেও কমিটি কাজ করবে বলে জানা গিয়েছিল।
সোমবার সিলেবাস কমিটির এক সদস্য জানান, নভেম্বরের মধ্যে ছাপাখানায় নতুন পাঠ্যবই ছাপতে দেওয়া হবে। জানুয়ারিতে পডু়য়াদের হাতে তুলে দেওয়া হবে সে বই। তাই ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে হবে। ফলে আপাতত পরিমার্জন করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘গণিত ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে বড়জোর ৫-১০ শতাংশ পরিবর্তন হতে পারে। বাংলা, ইংরেজি এবং ইতিহাসের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বদল আসতে পারে।’’
জানা গিয়েছে, বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার বদলে ‘শিবাজী উৎসব’ পাঠ্যভুক্ত হচ্ছে। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকের পরিবর্তে ঠাঁই পাচ্ছে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের ‘বঙ্গের প্রতাপাদিত্য’ নাটকটি।
একই ভাবে ইতিহাসের ক্ষেত্রে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে কমিটি। সে কারণে ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করা হবে দ্রুত। জানা গিয়েছে, পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে বাংলায় ভাষায় দীক্ষান্ত ভাষণ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তারকেশ্বরের সভার আয়োজন এবং তাঁর কাশ্মীর যাত্রা বিষয়ে বিশদে উল্লেখ থাকবে ইতিহাস বাইতে। ২০২৮ থেকে পাঠ্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা থাকছে বলে জানিয়েছেন পাঠ্যক্রম কমিটির ওই সদস্য। এর আগেই স্কুলশিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এই কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে কাজ করবে। সরকারি হস্তক্ষেপ থাকবে না। কমিটি সদস্য বলেন, “ইতিহাসে নতুন করে যে অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তার প্রামাণ্য নথি থাকতে হবে। তবেই অনুমোদন দেওয়া হবে।” কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে স্কুলশিক্ষা দফতর।