প্রায় ৮ বছর আগের কথা। স্কুলভবনে ‘নীল-সাদা’ রং করার নির্দেশের বিরুদ্ধে সরব হন ওই প্রধান শিক্ষক। অনড় ছিলেন গেরুয়া রঙেই। সরকারি নির্দেশের বিরোধিতা করে বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। তার পরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। এক বছর লড়াই করার পরে স্কুলবাড়ি নীল-সাদা রং করতে বাধ্য হন তিনি। এ বারে বদল হয়েছে সরকারের। স্কুলের পোশাকের রং বদল হওয়ারও সম্ভাবনা তৈরি রয়েছে। এই সময়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের ওই প্রধানশিক্ষক চন্দন মাইতি দাবি তুললেন, স্কুলের রং কী হবে, সেই স্বাধীনতা স্কুলের হাতেই ফিরিয়ে দেওয়া হোক। সরাসরি চিঠি লিখলেন স্কুলশিক্ষা কমিশনারকে।
২০১৮ সালের প্রথমেই স্কুলশিক্ষা দফতরের তরফে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং সরকার-পোষিত স্কুলে নীল–সাদা রং করার জন্য সরকারি নির্দেশ দেওয়া হয়। তৎকালীন স্কুলশিক্ষা সচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালার পাঠানো নির্দেশে বলা হয়েছিল, সরকারি নিয়মে যে রঙের কথা বলা আছে, সেটাই করতে হবে। স্কুলশিক্ষা দফতরের এক কর্তা জানিয়েছিলেন, ওই আমলে নীল-সাদাই সরকারি রং। তার পরে দেখা যায় রাজ্যের অধিকাংশ স্কুলকেই নীল-সাদা রং করতে হয়। তার জন্য অর্থ অবশ্য সরকারই দিয়েছে। এ বারে চন্দন মাইতির দাবি, আর্থিক সাহায্য সরকার করুক, কিন্তু কোন স্কুলে কোন রং হবে সেটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার স্কুলগুলিকেই দেওয়া হোক। তিনি একই সঙ্গে অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিসট্রেসেসের রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক। ফলে রাজ্যের প্রধানশিক্ষকদের একটি বড় অংশ এই দাবি করছে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবারে লেখা ওই চিঠিতে চন্দন লিখেছেন, ‘‘গত কয়েক বছরে রাজ্যের বহু বিদ্যালয়ের ভবন একই ধরনের নীল-সাদা রঙে রাঙানো হয়েছে। এর ফলে বহু বিদ্যালয় তাদের বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব রং হারিয়েছে, যা তাদের ইতিহাস, পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠানগত গৌরবের প্রতীক ছিল। প্রতিটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে এবং ভবনের মূল রং সেই পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।’’ তিনি আবেদন করেছেন, বিদ্যালয়ের ভবনগুলি যাতে তাদের পূর্বের মূল রং ফিরিয়ে আনতে পারে তার জন্য বিদ্যালয়শিক্ষা দফতর একটি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করুক। এ ভাবে বিদ্যালয়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যও পুনরুজ্জীবিত হবে।
বিগত সরকারের আমলেও কিছু প্রধানশিক্ষক ছিলেন যাঁরা স্কুলভবনের রঙের বদল হতে দেননি।
আরও পড়ুন:
নারায়ণ দাস বাঙুর মেমোরিয়াল মাল্টিপারপাস স্কুলের প্রধানশিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়া বলেন, ‘‘আমার স্কুল কোনও দিন নীল-সাদা করা হয়নি, তাই ভবন রং করার টাকাও পাইনি। টাকা না পেলেও ঐতিহ্যবাহী স্কুলের রং আমি বদল করতে দিইনি।’’
যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধানশিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য বলেন, ‘‘আমি ২০২১ সালে কালিকাপুর রামকমল বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক ছিলাম। তখন আমি স্কুলবাড়ি নীল-সাদা করিনি। কারণ বরাবর যে রং ছিল সেটাই ছিল স্কুলের ঐতিহ্য। ফলে সব স্কুল নীল-সাদা করার পক্ষে আমি নই। পাশে পেয়েছিলাম সভাপতি মাধবচন্দ্র মণ্ডল মহাশয়কে, যিনি তৎকালীন সরকারি দলের পদাধিকারী ছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি আমাকে সমর্থন করেছিলেন। আমি মনে করি স্কুলগুলির সবার নিজস্ব পৃথক ঐতিহ্য রয়েছে, যে ঐতিহ্য পোশাকের এবং স্কুলের রঙের সঙ্গে সম্পর্কিত।’’
সম্প্রতি স্কুলের পোশাকের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানাচ্ছে শিক্ষামহল। যে কারণে দফতরের তরফ থেকে জেলাস্কুল পরিদর্শকদের পাঠানো নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে যে, ২০২২ শিক্ষাবর্ষের আগে স্কুলের পোশাকের জন্য যে রঙের কাপড় ব্যবহার করা হত, তার উপর ভিত্তি করেই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য জেলাভিত্তিক সমীক্ষা চালাতে হবে। প্রতিটি জেলার স্কুল পরিদর্শকদের, তাঁদের এক্তিয়ারভুক্ত সব সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলিতে এই সমীক্ষা চালাতে হবে। তার পর বিদ্যালয়গুলির দেওয়া সব তথ্য যাচাই করে নির্দেশিকা জারির দিন থেকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংকলিত জেলাভিত্তিক রিপোর্ট জমা দিতে হবে। ফলে পোশাকের রং যে বদলাচ্ছে সেটা প্রায় নিশ্চিত বলে জানান একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক।