সারা বিশ্বেই কমে যাচ্ছে পড়াশোনার অভ্যাস। অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে সমীক্ষা রিপোর্ট। এ জন্য অনেক সময় করোনা অতিমারি পর্বকে দায়ী করা হলেও তা মানতে নারাজ অর্গানাইজ়েশন ফর ইকোনমিক কো-অপরেশন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (ওইসিডি)। তারাই জানিয়েছে, সারা বিশ্বেই ক্রমশ পাঠ, গণিত এবং বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে আগ্রহ কমেছে পড়ুয়াদের মধ্যে। ক্রমাবনতি ঘটেছে পঠনপাঠনের মানে।
মোট ৩৮টি সদস্য দেশকে নিয়ে গঠিত ওইসিডি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর সরকারি নীতি তৈরির জন্য গবেষণা করে। তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তারা নীতিগত পরামর্শ দিয়ে থাকে। সম্প্রতি ওইসিডি প্রকাশ করেছে প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসেসমেন্ট বা ‘পিসা’ ২০২৫। সেখানেই আন্তর্জাতিক পড়ুয়াদের পঠনপাঠনের মান সংক্রান্ত সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।
ওইসিডি জানিয়েছে, পড়াশোনায় মনোযোগ, ধারাবাহিক ভাবে শেখার আগ্রহ এবং মৌলিক দক্ষতায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে পড়ুয়াদের মধ্যে। বিশ্বের বহু দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে। এ জন্য অনেকাংশেই দায়ী কোভিড-১৯ অতিমারির সময়কালে স্কুল বন্ধ থাকা এবং পড়াশোনায় দীর্ঘ ব্যাঘাত।
তবে শুধু মাত্র এ জন্য যে পড়ুয়াদের ফল খারাপ হচ্ছে, তা নয়। অতিমারির আগে থেকেই কয়েকটি ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গিয়েছিল বলে দাবি। এর নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত সমস্যাও, এমনই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। গত ৮ সেপ্টেম্বর ‘পিসা ২০২৫’-এর ফল প্রকাশ করেছে ওইসিডি। ‘ফিউচার-রেডি স্টুডেন্টস’ শীর্ষক রিপোর্টের প্রথম খণ্ডে ৯১টি দেশের ৭ লক্ষ ৬০ হাজারেরও বেশি পড়ুয়ার মূল্যায়ন করা হয়েছে, যাদের বয়স ১৫ বছর বা তার কম। ২০২৫ সালের সমীক্ষার মূল বিষয় ছিল বিজ্ঞান। যদিও এরই পাশাপাশি পড়ুয়াদের পাঠ (রিডিং), গণিত এবং ডিজিটাল দক্ষতার মূল্যায়নও করা হয়েছে।
ওইসিডি-র রিপোর্ট বলছে, সমীক্ষাভুক্ত দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গিয়েছে পাঠের ক্ষেত্রে। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গড় পাঠের স্কোর ২৮ পয়েন্ট কমেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় দেড় বছর পিছিয়ে যাওয়ার সমান এই পতন, দাবি ওসিডি-র। পাশাপাশি এই সময়কালে গণিতে গড় স্কোর ২২ পয়েন্ট কমেছে, যা এক বছরেরও বেশি সময়ের শিক্ষণ-ঘাটতির সমান।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল বলে দাবি করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিজ্ঞানের ফল নিম্নমুখী হলেও ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ওইসিডি দেশগুলিতে গড় স্কোরে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন:
এই অধঃপতনের নেপথ্যে কোভিড অতিমারির ভূমিকা থাকলেও বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন মৌলিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়া পড়ুয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। ওইসিডি-র রিপোর্ট অনুযায়ী সমীক্ষাভুক্ত দেশগুলিতে প্রায় প্রতি পাঁচ জন ১৫ বছর বয়সি পড়ুয়ার মধ্যে একজন বিজ্ঞান, গণিত এবং পাঠ— তিনটি ক্ষেত্রেই ন্যূনতম দক্ষতার স্তরের নীচে অবস্থান করছে। অর্থাৎ, প্রায় ২০ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৬ শতাংশ।
এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে ওইসিডি-র রিপোর্টে। তাদের দাবি, শিক্ষাক্ষেত্রে পড়ুয়াদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রভাব বিস্তর। তুলনামূলক ভাবে সুবিধাজনক পরিবারের পড়ুয়ারা বিজ্ঞানে ভাল ফল করছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই ব্যবধান কমেছে। তবে তা মোটেও ইতিবাচক পরিবর্তন নয়। ওইসিডি বলেছে, এর প্রধান কারণ অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের বড় ধরনের উন্নতি নয়; বরং সুবিধাজনক পরিবারের পড়ুয়াদের ফলাফলের অবনতি।
শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছে ওইসিডি। সংস্থার দাবি, সঠিক ভাবে ব্যবহার করা হলে এই প্রযুক্তি শিক্ষণ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ওই প্রযুক্তি যেন পড়ুয়ার মনোযোগ, পরিশ্রম এবং বিষয়ের বোধগম্যতা প্রক্রিয়ার বিকল্প না হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:
উল্লেখ্য, ভারত এই সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত নয়। ২০০৯ সালে ৭৪টি দেশর উপর সমীক্ষা করেছিল সংস্থাটি। ভারতকে রাখা হয়েছিল ৭২তম স্থানে। সে সময়ই পিসা-র প্রশ্নপদ্ধতি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সাযুজ্যহীন বলে দাবি করেছিল কেন্দ্র। তার পর থেকে এই সমীক্ষা যোগ দেয় না ভারত। ২০২২ ও ২০২৫ সালে অবশ্য যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল দেশ। তবে করোনা অতিমারির কারণে পড়াশোনার ক্ষতি এবং নীতিগত পরিবর্তনের কথা জানিয়ে দেশ শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়নি। এ দেশে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের (যেমন এনএএস) উপরই জোর দেওয়া হয়।