বিশ্ব জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পানীয় জলের ক্রমবর্ধমান ঘাটতির যুগে ‘ওয়াটার রিসোর্স অ্যান্ড হাইড্রোলজি’ বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে উঠেছে। ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের জলের সঠিক বণ্টন, জলের গুণমান রক্ষা, বাঁধ ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা বা খরার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার বিজ্ঞানসম্মত চর্চাই হল এই বিষয়ের মূল। পরিবেশবিজ্ঞান ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই বিশেষ শাখাটিতে বর্তমানে দেশ-বিদেশে কাজের সুযোগ বেশ ভাল।
ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং হাইড্রোলজি— দু’টি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত বিষয়। হাইড্রোলজিতে জলচক্র, বৃষ্টিপাত, নদী ও ভূগর্ভস্থ জল নিয়ে পড়াশোনা করা হয়। অন্য দিকে ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে জলসম্পদের সঠিক ব্যবহার, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়।
এই পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীদের নদীর প্রবাহ বিশ্লেষণ, বাঁধের নকশা তৈরি, বর্জ্য শোধন, এবং আধুনিক উপগ্রহ প্রযুক্তি বা জিআইএস-এর সাহায্যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জলের সম্পর্কের মডেল তৈরি করার মতো নানা ব্যবহারিক পাঠ শেখানো হয়।
পড়াশোনার সুযোগ
ভারতে সাধারণত দ্বাদশ শ্রেণির পর হাইড্রোলজি অথবা ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সরাসরি স্নাতক স্তরের কোর্সের সুযোগ সীমিত। শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্নাতক স্তরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, জিয়োলজি অথবা এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স-এর মতো বিষয়ে পড়েন। এর পর স্নাতকোত্তরে সরাসরি এমটেক ইন ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং, এমটেক ইন হাইড্রোলজি অথবা এমএসসি ইন অ্যাপ্লায়েড হাইড্রোলজি-র মতো নির্দিষ্ট কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। পাশাপাশি, স্নাতকোত্তর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে গেট স্কোরের মাধ্যমে আইআইটি ও এনআইটি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়। তবে যোগ্যতা ও ভর্তি-নিয়ম প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা থাকে। এ ছাড়া, বিজ্ঞান পড়ুয়ারা এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, জিয়োলজি বা ফিজিক্সে এমএসসি করার পরও হাইড্রোলজি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করতে পারেন।
ভারতে উচ্চমানের ইঞ্জিনিয়ারিং ও গবেষণা কেন্দ্রগুলিতে এই বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে। আইআইটি রুরকিতে আলাদা ভাবে হাইড্রোলজি বিভাগ রয়েছে। সেখানে সারফেস ওয়াটার হাইড্রোলজি, গ্রাউন্ডওয়াটার, ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট, ওয়াটার রিসোর্সেস সিস্টেমস, হাইড্রো-ইনফরমেটিক্স এবং ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর মতো বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ থাকে। এ ছাড়াও, আইআইটি খড়গপুর, আইআইটি বম্বে এবং আইআইটি মাদ্রাজ-এ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও, এনআইটি তিরুচিরাপল্লী, এনআইটি ওয়ারঙ্গল-সহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়া যায়। পাশাপাশি, পঞ্জাব এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়ন্স বেঙ্গালুরুতেও পড়া যায়।
কাজের সুযোগ
জলসম্পদের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মী তৈরিতে এই ক্ষেত্রের চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে। এই বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রার্থীরা সাধারণত হাইড্রোলজিস্ট, ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ার, এনভায়রনমেন্টাল কনসালট্যান্ট, হাইড্রোজিওলজিস্ট এবং ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করতে পারেন।
বিভিন্ন পরিবেশবিষয়ক পরামর্শদাতা সংস্থা, পরিকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, মাইনিং সংস্থা এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী বেসরকারি সংস্থায় চাকরির সুযোগ রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও জলসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন— জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাঙ্ক এবং এডিবি-র মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক স্তরে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ওয়াটার রিসোর্সেস বা হাইড্রোলজি বিষয়ে ডিগ্রি থাকলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কারিগরি, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পদে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কেন্দ্রীয় স্তরে সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন (সিডব্লিউসি), সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ড (সিজিডব্লিউবি), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হাইড্রোলজি (এনআইএইচ) এবং ইন্ডিয়া মেটিরিয়োলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (আইএমডি)-এর মতো প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত, গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাজ্য স্তরে, রাজ্য সেচ ও জলপথ দফতর, জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর এবং পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগে নানা পদে নিয়োগ হয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। নানা পাবলিক সেক্টর সংস্থা, যেমন— এনএইচপিসি, ডব্লুএপিসিওএস লিমিটেড, জলশক্তি মন্ত্রকের অধীন বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্পে কাজের সুযোগ রয়েছে।