দিল্লির যন্তর মন্তর, আইআইটি বম্বে, অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)— দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের আন্দোলন এবং তার জেরে তৈরি হওয়া সংঘাতকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ পড়ুয়ারা।
তাঁদের দাবি, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শিক্ষার পরিবেশের উপরে আঘাত হানার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তারই একটি অংশ এসআরএফটিআই-এর সাম্প্রতিক ঘটনা। সেই কারণে নিজেদের ক্যাম্পাসের আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যেতে চাইছেন তাঁরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে সম্মিলিত আন্দোলনের রূপরেখা তৈরির পরিকল্পনা করছেন আন্দোলনকারীরা। কোথাও বুক স্টল ভাঙা, কোথাও ছাত্রছাত্রীদের উপরে আঘাত, সার্বিক ভাবে এই ঘটনাগুলিকে শিক্ষার উপরে আক্রমণ হিসেবেই দেখছেন তাঁরা।
এসআরএফটিআই-এ পড়ুয়াদের লাগাতার আন্দোলন বৃহস্পতিবার ২৫ দিনে পড়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে গোলমালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর পর ৪ অক্টোবর ফের হামলার অভিযোগ ওঠে। পর পর এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ঘটনার প্রতিবাদে পড়ুয়াদের আন্দোলন শুরু হয়। এক দিকে পড়ুয়াদের অভিযোগ ও প্রতিবাদ, অন্য দিকে কর্তৃপক্ষের পাল্টা অভিযোগ— দুইয়ের জেরে ক্রমশ সংঘাত বাড়তে থাকে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির যথাযথ সমাধান এবং পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ আরও বেড়েছে। অন্য দিকে, কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় উপাচার্য সন্তোষ অজমেরাকে হেনস্থা করা হয়েছে এবং তাঁর ঘরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ছয় পড়ুয়াকে দু’টি সেমেস্টারের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেও পড়ুয়াদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি-সহ একাধিক দাবিতে ক্যাম্পাসে লাগাতার অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
পড়ুয়াদের দাবি, এসআরএফটিআই-এর ঘটনাকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলে বৃহত্তর ছবিটি আড়ালে থেকে যাবে। তাঁদের মতে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের প্রতিবাদ, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে। গত অগস্টে মধ্য রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে তাণ্ডবের ঘটনাও ফের তুলে আনেন তাঁরা। কোথাও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সংঘাত, কোথাও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ, আবার কোথাও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই ঘটনাগুলির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে বলেই মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, শিক্ষার পরিবেশ এবং ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবাদকে দমনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এসআরএফটিআই-এর পড়ুয়া সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বম্বে, জেএনইউ, যন্তর মন্তর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা এসআরএফটিআই— কোনও ঘটনাকেই আলাদা করে দেখার কোনও অর্থ নেই। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এবং তার মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের ভূমিকার মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। শিক্ষার উপরে আঘাত এবং পড়ুয়াদের কণ্ঠরোধের যে প্রবণতা তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন। সেই কারণেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের একজোট করার উদ্যোগী হচ্ছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
এই উদ্যোগের নেপথ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা যদি নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দাবিদাওয়া নিয়ে একত্রিত হন, তা হলে শিক্ষার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশের মতো বৃহত্তর বিষয়গুলি নিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনা ও আন্দোলনের সুযোগ তৈরি হবে। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চাইছেন তাঁরা।
এ দিকে, আন্দোলনের জেরে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পঠনপাঠন এবং পড়ুয়াদের দৈনন্দিন জীবনও সমস্যার মুখে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের তরফে হস্টেল এবং মেস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে বলে অভিযোগ পড়ুয়াদের। ফলে যাঁরা হস্টেলে থাকেন, তাঁদের থাকা এবং খাওয়াদাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষত, যাঁরা রাজ্যের বাইরে থেকে পড়তে এসেছেন, তাঁদের পক্ষে অল্প সময়ের মধ্যে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পড়ুয়ারা। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের উদ্যোগে কমিউনিটি কিচেন চালু করেছেন আন্দোলনকারীরা। তার মাধ্যমে কোনও রকমে খাবারের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শুধু পড়ুয়াদের মধ্যেই নয়, অভিভাবকদের মধ্যেও পৌঁছেছে এই সংঘাতের আঁচ। কর্তৃপক্ষের তরফে পড়ুয়াদের অভিভাবকদের ই-মেল পাঠিয়ে ক্লাস বন্ধ থাকার বিষয়টি জানানো হয়েছে। এর ফলে পড়ুয়াদের শিক্ষাজীবন, আবাসন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক দিকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, অন্য দিকে পঠনপাঠন ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা— এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে পড়ুয়াদের।
তবে আন্দোলনকারীরা জানাচ্ছেন, এই পরিস্থিতিতে তাঁরা পিছিয়ে আসতে চান না। তাঁদের বক্তব্য, এসআরএফটিআই-এর সমস্যা মিটিয়ে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যেমন জরুরি, তেমনই দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই উপাচার্যের পদত্যাগ-সহ নিজেদের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৃহত্তর ছাত্র ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
২৫ দিনের আন্দোলনের পর এখন এসআরএফটিআই-এর পড়ুয়াদের সামনে প্রধান লক্ষ্য, নিজেদের দাবিকে জাতীয় স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের একটি সম্মিলিত মঞ্চে আনা। আপাতত নিজেদের ক্যাম্পাসের আন্দোলন অব্যাহত রেখেই দেশ জুড়ে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার পথে এগোতে চাইছেন এসআরএফটিআই-এর পড়ুয়ারা।