দীর্ঘ যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজ়া। ঘরছাড়া বহু মানুষ। মাথার উপর ছাদ নেই, দু’বেলা খাবার জোটাই কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে গাজ়ার শিশুদের কাছে স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল স্কুল। প্রায় তিন বছর পর, সশরীরে স্কুলে ফিরল কয়েক লক্ষ শিশু।
চারপাশে ধ্বংসস্তূপ, বই-খাতার অভাব, তারই সঙ্গে বোমারু বিমানের ত্রাস— এমনই আবহে তাঁবু, ত্রিপল, টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠদান। প্রতিকূলতার মধ্যেও শিশুদের হাতে আবার ফিরেছে বই-খাতা, শুরু হয়েছে শ্রেণিকক্ষে ফেরার নতুন পথচলা।
রয়টার্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলির সহযোগিতায় শিক্ষামন্ত্রক ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা চালু করেছে। ইউনিসেফ-এর সহায়তায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই শিক্ষাবর্ষের জন্য গাজ়া জুড়ে অন্তত ৩৫৯টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র ও তাঁবু-স্কুল তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, এ বছর প্রায় ৫,৪০,০০০ শিক্ষার্থী এই সব অস্থায়ী স্কুল ও লার্নিং পয়েন্টে পড়াশোনা করবে। আর যারা এখনও গাজ়ার বাইরে রয়েছে বা সরাসরি আসতে পারছে না, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষা চালু থাকবে।
দীর্ঘদিনের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত গাজ়ার শিক্ষাকাঠামোকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ইউনিসেফ-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজ়ার প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যালয়ভবনেই হামলা চালানো হয়েছে অথবা সেগুলি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বলে খবর। স্কুল ফের খোলার পরিস্থিতি যে এখনও কতটা অনিশ্চিত, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইস্ট খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমজান জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে প্রায় ২২,০০০ শিক্ষার্থী এবং ৭৭০ জনেরও বেশি শিক্ষাকর্মী (এঁদের মধ্যে ৫৩২ জন শিক্ষক) প্রাণ হারিয়েছেন। সংঘাতের কারণে গাজ়ার প্রায় ৬,৬০,০০০ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল।
আরও পড়ুন:
-
তিনটি যুদ্ধের সাক্ষী, ৮৫ বছরে এমএ পাশ! শিক্ষার কোনও বয়স হয় না প্রমাণ করলেন প্রাক্তন জওয়ান, এ বার লক্ষ্য পিএইচডি
-
উচ্চশিক্ষার জন্য পছন্দের দেশ জার্মানি, রইল ভিসার শর্তাবলি, খরচ-সহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা
-
দ্বাদশের বাতিল ৪০টি বিষয়ে ফের পরীক্ষা! যুদ্ধবিধ্বস্ত ৭টি দেশের পরীক্ষার্থীদের ফি ছাড়াই সুযোগ দেবে সিবিএসই
দীর্ঘদিন পর স্কুলে ফিরতে পেরে শিশুদের মুখে হাসি ফুটলেও বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত মর্মান্তিক। মোয়াদ আবু মুস্তাফা নামে এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘‘তিন বছর পর স্কুলে ফিরলাম। আমাদের কাছে ভাল জুতো নেই, খাতা-কলম নেই, যুদ্ধে অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। তবু তাঁবুর ভিতরে হলেও আমরা পড়াশোনা চালিয়ে যাব।’’
অন্য দিকে, পনেরো বছর বয়সি সমর আবু সালমি জানায়, এখন সে বাস্তুহারা। এত দিন মোবাইলে পড়াশোনা করেছে, কেউ কাউকে সামনাসামনি দেখতে পায়নি। তবে শত প্রতিকুলতা থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। তাই এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুতে গিয়ে পড়াশোনা করছে। ইয়েমেন আবু সামরা নামের আরেক পড়ুয়ার কথায় উঠে আসে যুদ্ধের ভয়াবহ আতঙ্কের কথা। সে জানায়, ‘‘আগে আমরা আনন্দে স্কুলে যেতাম। এখন স্কুলে এলে ভয় করে, যে কোনও সময় মিসাইল বা বুলেট ছুটে আসতে পারে। মাথার ওপর শুধু কড়া রোদ আর তপ্ত তাঁবু ছাড়া আর কিছুই নেই।’’