মানুষের মস্তিষ্ক কী ভাবে কাজ করে, স্মৃতি তৈরি হয় কী ভাবে, আমরা কী ভাবে কোনও কিছু দেখি, শুনি, শেখা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কাজ করি—এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে নিউরোসায়েন্স ও কগনিটিভ সায়েন্স। মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, আচরণ, মনস্তত্ত্ব এবং প্রযুক্তির সংযোগস্থলে তৈরি হয়েছে এই দুই আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র। ফলে জীববিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়ুয়াদের পাশাপাশি মনোবিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স, গণিত, ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য বিজ্ঞানের পড়ুয়াদের কাছেও এই ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে।
নিউরোসায়েন্স ও কগনিটিভ সায়েন্স কী?
মূলত মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের গঠন এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে পড়াশোনাই হল নিউরোসায়েন্স। নিউরনের কাজ, স্নায়ু-সংযোগ, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের ভূমিকা, শেখা ও তা মনে রাখা, ইন্দ্রিয়গ্রহণ, মোটর কন্ট্রোল এবং বিভিন্ন নিউরোলজিক্যাল সমস্যার জৈবিক ভিত্তি—এই ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্য দিকে, কগনিটিভ সায়েন্স মানুষের চিন্তাভাবনা ও মানসিক প্রক্রিয়া বোঝার একটি আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র। কগনিটিভ সাইকোলজি, নিউরোসায়েন্স, দর্শন, ভাষাবিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়কে একসঙ্গে ব্যবহার করে মানুষের মন ও আচরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করা হয়।
কী পড়তে হয়?
নিউরোসায়েন্সে অ্যানাটমি, নিউরোঅ্যানাটমি, সেলুলার ও মলিকিউলার নিউরোসায়েন্স, নিউরোফিজ়িওলজি, নিউরোকেমিস্ট্রি, সিস্টেমস নিউরোসায়েন্স, সেনসেশন ও পারসেপশন, লার্নিং অ্যান্ড মেমরি এবং নিউরোবায়োলজির মতো বিষয় পড়ানো হয়। গবেষণামূলক কোর্সে ব্রেন ইমেজিং, নিউরোফিজ়িওলজি, বিহেভিয়োরাল অ্যাসেসমেন্ট এবং বিভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতিও রয়েছে।
আইআইএসসি-র নিউরোসায়েন্স গবেষণায় ডেভেলপমেন্টাল নিউরোসায়েন্স, লার্নিং অ্যান্ড মেমরি, ভিজ়ুয়াল পারসেপশন, কগনিটিভ ও কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্স, অ্যাটেনশন, ডিসিশন মেকিং, ইমোশন ও রিওয়ার্ড প্রসেসিং-এর মতো ক্ষেত্র রয়েছে।
কগনিটিভ সায়েন্সে কগনিটিভ সাইকোলজি, কম্পিউটেশন অ্যান্ড কগনিশন, ফিলজ়ফি অফ মাইন্ড, ফান্ডামেন্টাল নিউরোসায়েন্স, রিসার্চ মেথডস এবং এক্সপেরিমেন্টাল টেকনিক্স পড়ানো হয়। উচ্চতর পর্যায়ে লার্নিং অ্যান্ড মেমরি, পারসেপশন অ্যান্ড অ্যাটেনশন, কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন, ডিসিশন মেকিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্স, ব্রেন ইমেজিং, হিউম্যান-রোবট ইন্টারঅ্যাকশন ও কগনিটিভ লিঙ্গুইস্টিক্সের মতো বিষয়ও বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কারা পড়তে পারেন?
এই ক্ষেত্রে পড়ার সুযোগ নির্দিষ্ট একটি ধারার পড়ুয়াদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোর্সভেদে যোগ্যতার শর্ত আলাদা। আইআইটি গান্ধীনগরের এমএসসি কগনিটিভ সায়েন্সে যে কোনও বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি থাকলেই আবেদন করা যায়। বিএ, বিএসসি, বিটেক, বিকম এমনকি এমবিবিএস ডিগ্রিধারীরাও নির্দিষ্ট নম্বরের শর্ত পূরণ করলে আবেদন করতে পারেন।
নিউরোসায়েন্সে অবশ্য জীববিজ্ঞান বা স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের পাশাপাশি পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইকোলজি বা মেডিসিনের ব্যাকগ্রাউন্ডও কাজে আসে। ন্যাশনাল ব্রেন রিসার্চ সেন্টারের এমএসসি নিউরোসায়েন্সে লাইফ সায়েন্সেস, ফিজ়িক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথেমেটিক্স, স্ট্যাটিস্টিক্স, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ফার্মেসি, সাইকোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনোলজি ও মেডিসিন-সহ একাধিক ব্যাকগ্রাউন্ডের স্নাতকদের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
কোথায় পড়ার সুযোগ?
সরকারি ও কেন্দ্রীয় শিক্ষা-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি), বেঙ্গালুরু-তে নিউরোসায়েন্সে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। আইআইএসসি-র এমএসসি লাইফ সায়েন্সেসেও ‘নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড বিহেভিয়ার’ একটি গবেষণার ক্ষেত্র। পাশাপাশি, নিউরোসায়েন্সে ইন্টিগ্রেটেড পিএইচডি এবং সাধারণ পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে।
ন্যাশনাল ব্রেন রিসার্চ সেন্টারে (এনবিআরসি) এমএসসি নিউরোসায়েন্স এবং পিএইচডি ইন নিউরোসায়েন্স রয়েছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস (নিমহ্যান্স), বেঙ্গালুরু-তেও এমএসসি ইন নিউরোসায়েন্স রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এই কোর্সে লাইফ সায়েন্সেস, বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস, এমবিবিএস, বিডিএস, বিফিজ়িওথেরাপি, বিফার্মা, বিই বা বিটেক-সহ নির্দিষ্ট যোগ্যতার প্রার্থীরা আবেদন করতে পারেন।
অন্য দিকে, আইআইটি দিল্লি-তে দুই বছরের পূর্ণকালীন এমএসসি কগনিটিভ সায়েন্স চালু রয়েছে। এই কোর্সে মানুষের মন ও কগনিটিভ প্রক্রিয়া বোঝার পাশাপাশি গবেষণা ও শিল্পক্ষেত্রে কাজের উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলেই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে জানা গিয়েছে।
আইআইটি গান্ধীনগর-এও দুই বছরের এমএসসি কগনিটিভ সায়েন্স রয়েছে। কোর্সটিতে কগনিটিভ সায়েন্সের পাশাপাশি নিউরোসায়েন্স, এআই, কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্স, ব্রেন ইমেজিং এবং হিউম্যান-রোবট ইন্টারঅ্যাকশনের মতো বিষয় রয়েছে।
পেশাগত সুযোগ কেমন?
এই পড়াশোনা শেষ করে গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নিউরোটেকনোলজি, হেলথ-টেক, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস, রোবোটিক্স, ইউজ়ার রিসার্চ এবং হিউম্যান-মেশিন ইন্টারঅ্যাকশনের মতো ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কগনিটিভ সায়েন্সের ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট, ডিজ়াইন, স্মার্ট সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি-ভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রেও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু একটি স্বল্পমেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স করলেই এই ক্ষেত্রে বিশেষায়িত চাকরি পাওয়া নিশ্চিত নয়। গবেষণার দক্ষতা, ডেটা অ্যানালিসিস, প্রোগ্রামিং, পরীক্ষামূলক পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষা থাকলে বাড়তি সুবিধা মিলতে পারে। মস্তিষ্ক, মানুষের আচরণ, প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ থাকলে নিউরোসায়েন্স ও কগনিটিভ সায়েন্স ভবিষ্যতের জন্য একটি বিশেষায়িত কেরিয়ার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।