কলকাতার দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের উপর হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন কলকাতার সুশীলসমাজ। মঙ্গলবার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও এসআরএফটিআই-এ হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে বিবৃতি দেন বুদ্ধিজীবীদের একাংশ।
ওই বিবৃতিতে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজকে সম্বোধন করে লেখা হয়েছে, ২০ অগস্ট গভীর রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবর সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এ যে ভাবে পুলিশের সামনে আক্রান্ত হয়েছে ছাত্রসমাজ, তাতে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে প্রশাসনের কাছে নিরপক্ষে তদন্ত দাবি তোলা হয়েছে।
অধ্যাপক সুজাত ভদ্র মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা আসলে ‘ক্ষমতার অপপ্রয়োগ’। ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মতবিরোধে যে ভাবে সরকারপক্ষ জড়িয়ে পড়ছে তাকে দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন তিনি। সুজাতের কথায়, “যাদবপুরের ঘটনায় প্রথমে বিজেপি বিধায়ক তো জড়িয়ে গেলেন। পরে খোদ মুখ্যমন্ত্রী তো একেবারে ক্যাম্পাসের বাইরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন।’’ যাদবপুরের এই প্রাক্তনী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ে তাঁদের সঙ্গেও অন্য ছাত্রদের গোলমাল হয়েছে। কিন্তু সেটা তাঁদের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি বলেন, “এ ভাবে বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে হামলা চালানো বা প্রশাসনের মধ্যে জড়িয়ে পড়া কার্যত দখলদারির মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। কোনও সমস্যার নিরপেক্ষ তদন্তের বদলে একজন মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে দেখে নেওয়ার হুমকি দিলেন সেটা দুর্ভাগ্যজনক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেটা প্রতিষ্ঠা হল না।”
আরও পড়ুন:
শিক্ষাবিদ বোলান গঙ্গোপাধ্যায় জানান, শিক্ষাঙ্গনে এই আঘাত সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চলছে। এ রাজ্যেও তা প্রকট হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন এই আঘাত পরিকল্পিত। এই রাজ্যে সরকার প্রত্যক্ষ ভাবে সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, ‘‘বিধায়ক বিষয়টিকে সমর্থন করছেন। মুখ্যমন্ত্রীও যে সব কথা বলছেন, তাতেও এই আক্রমণের সমর্থনই ধরা পড়ছে।’’ বোলানের দাবি, এ ভাবে চলতে থাকলে শিক্ষা বাঁচবে না। আন্দোলনকারী ছাত্রদের প্রতিবাদের অধিকার হরণ ও তাঁদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে দাগিয়ে দেওয়ারও প্রতিবাদ করেন তিনি। ছাত্রসমাজকে এ ভাবে আক্রমণ করলে দেশের ভবিষ্যৎটাই অন্ধকার হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
বোলানের কথায়, ‘‘এত খারাপ সময় আগে কখনও দেখিনি। প্রতিশ্রুতি আর টাকার বরাদ্দ দিয়ে তো রাজ্য চলবে না। তার জন্য শিক্ষা লাগবে, স্বাস্থ্য লাগবে। আমরা ভয় পাচ্ছি।’’
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের সংগঠন সম্পাদক বিপুল সরকার বলেন, “এই সরকার কোনওভাবেই মুক্তমনার বিরুদ্ধে নয়। সরকার স্বাধীন মতপ্রকাশ, স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং স্বাধীন ভাবে পড়াশোনার পক্ষে। তবে সেই স্বাধীনতা যদি নিয়মানুবর্তিতায় আঘাত করে বা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে, সেক্ষেত্রে সকলকে সুশৃঙ্খল রাখতে হস্তক্ষেপ করতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “এর অর্থ দখলদারি করা নয়, যুদ্ধ ঘোষণা করাও নয়। সরকারের সেই উদ্দেশ্য নেই। আমরা চাই, সবাই ভাল ভাবে পড়াশোনা করুক এবং পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার মান আরও উন্নত হোক।”