বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করলে বিষয় নির্বাচন প্রথমেই করতে হয়। কোন বিষয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক স্তরে কাজের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে, কোন কোর্সের চাহিদা বাড়ছে এবং পড়াশোনার জন্য কত টাকা খরচ হতে পারে—এমন নানা প্রশ্ন থাকে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের মনে। সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, ব্যবসা ও ম্যানেজমেন্ট, কম্পিউটার সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা সায়েন্সের মতো পরিচিত বিষয়গুলির পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বিশেষায়িত প্রযুক্তির কোর্সেও আগ্রহ বাড়ছে। কিউএস-এর ২০২৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিদেশে পড়তে ইচ্ছুক ভারতীয় পড়ুয়াদের মধ্যে বিজ়নেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয়গুলির একটি।
কোন কোন কোর্স জনপ্রিয়?
১। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্স:
প্রযুক্তির দুনিয়ায় কাজ করতে আগ্রহী পড়ুয়াদের কাছে এই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং রোবোটিক্স নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়ার সুযোগ রয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স, গণিত বা পরিসংখ্যানের পটভূমি থাকলে এই ধরনের কোর্সে সুবিধা হতে পারে।
২। বিজ়নেস ম্যানেজমেন্ট ও ফিন্যান্স: এমবিএ, বিজ়নেস অ্যানালিটিক্স, ফিনটেক, সাপ্লাই চেন ম্যানেজমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা নিয়ে পড়ার চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে কর্পোরেট সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পরামর্শদাতা সংস্থা কিংবা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কাজ করতে চাইলে এই বিষয়গুলি বিবেচনা করা যায়।
৩। সাইবার নিরাপত্তা: অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল পরিষেবা এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষ পেশাদারদের প্রয়োজন হয়। সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল ফরেনসিক্স এবং নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি নিয়ে বিশেষায়িত কোর্স করতে পারেন পড়ুয়ারা।
৪। বায়োটেকনোলজি ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান: বায়োটেকনোলজি, বায়োইনফরমেটিক্স, পাবলিক হেলথ এবং হেলথ ইনফরমেটিক্সের মতো বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। গবেষণা, ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজে আগ্রহীদের কাছে এই বিষয়গুলি আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে চিকিৎসক বা নার্স হিসাবে কাজ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের পেশাগত স্বীকৃতি ও লাইসেন্সের নিয়ম আলাদা করে জানতে হবে।
৫। পরিবেশ ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি নিয়ে কাজ করতে চাইলে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, ক্লাইমেট সায়েন্স, রিনিউয়েবল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সাসটেনেবিলিটি ম্যানেজমেন্ট পড়া যায়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও শক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত পেশায় এই বিষয়গুলি কাজে লাগতে পারে।
প্রচলিত কোর্সের বাইরে আগ্রহ থাকলে পড়ুয়ারা স্পোর্টস অ্যানালিটিক্স, মিউজ়িয়াম স্টাডিজ়, আর্কিয়োলজি, কালচারাল হেরিটেজ ম্যানেজমেন্ট, ফুড সায়েন্স, মেরিন সায়েন্স কিংবা গেম ডিজ়াইন নিয়ে পড়া যেতে পারে। খেলাধুলার তথ্য বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, খাদ্যের গুণমান পরীক্ষা এবং ডিজিটাল গেম তৈরির মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজের পথ খুলতে পারে এই কোর্সগুলি। তবে বিষয় বাছার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্সটির স্বীকৃতি, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং চাকরির সুযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
বিদেশে পড়তে খরচ কত?
খরচ নির্ভর করে দেশ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় এবং কোর্সের মেয়াদের উপর। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকায় এক বছরের পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা বা তারও বেশি লাগতে পারে। ব্রিটেনে এক বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স-সহ থাকা-খাওয়ার খরচ আনুমানিক ২৫ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা হতে পারে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বছরে প্রায় ২০ থেকে ৪৫ লক্ষ টাকা বা তার বেশি বাজেট রাখতে হতে পারে। এগুলি কেবল আনুমানিক হিসাব, নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি নয়। বিষয় ও শহরভেদে খরচ অনেকটাই বদলে যায়।
তুলনায় জার্মানির কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি কম বা নির্দিষ্ট শর্তে মকুব হতে পারে। তবে সেখানেও থাকা-খাওয়া, স্বাস্থ্যবিমা, সেমেস্টার ফি এবং ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। আবেদন করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে ফি ও বৃত্তির তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কী ভাবে বেছে নেওয়া যায় কোর্স?
শুধু জনপ্রিয়তা দেখে বিষয় নির্বাচন করা উচিত নয়। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আগ্রহ, ভাষাগত দক্ষতা, মোট বাজেট এবং ভবিষ্যতের পেশাগত পরিকল্পনা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইংরেজি ভাষার দক্ষতার প্রমাণ, আগের পরীক্ষার নম্বর, প্রয়োজনীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং আর্থিক নথিও প্রস্তুত রাখতে হতে পারে। পাশাপাশি, পড়াশোনা শেষে কাজের অনুমতি ও ভিসার নিয়ম দেশভেদে আলাদা—সেগুলিও যাচাই করা দরকার। উপযুক্ত কোর্স ও বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিতে পারলে বিদেশে পড়াশোনা শুধু ডিগ্রি অর্জনের নয়, নতুন দক্ষতা শেখা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা লাভেরও সুযোগ করে দিতে পারে।