সরকার ও সরকারপোষিত স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ক্রমশ কমছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ফেরাতে একাধিক পদক্ষেপ করতে চলেছে কলকাতা শিক্ষা প্রশাসন। স্কুলের সুযোগ সুবিধা, পঠনপাঠনের মান এবং সরকারি স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করানোর গুরুত্ব অভিভাবকদের সামনে তুলে ধরতে অভিনব প্রচার কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কলকাতার শিক্ষা ভবন সূত্রে খবর, সরকারি স্কুলের প্রচারে ট্যাবলো তৈরি করে মাইকের মাধ্যমে ওয়ার্ডভিত্তিক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
শিক্ষা প্রশাসনের এক কর্তা জানান, কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের পর নতুন বোর্ড গঠিত হলে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠক করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলিতে কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় প্রচার চালানো হবে। ট্যাবলোর মাধ্যমে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ সুবিধা, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, আর্থিক সহায়তা এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য কী কী সুবিধা রয়েছে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি মাইকের মাধ্যমে প্রচার করে এলাকার অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। সরকারি স্কুল সম্পর্কে অভিভাবকদের মধ্যে যে অনীহা বা সংশয় তৈরি হয়েছে, তা দূর করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে শিক্ষা প্রশাসনের কর্তারা মনে করছেন, কেবল প্রচার চালিয়ে সরকারি স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশের পরিবর্তন এবং পঠনপাঠনের মান বাড়ানোও সমান জরুরি। সেই কারণেই প্রচারের পাশাপাশি স্কুলগুলির বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৫০০টি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শনের পরিকল্পনা
শিক্ষা ভবন সূত্রে খবর, কলকাতার প্রায় ৫০০টি উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সরকারি স্কুলকে আধিকারিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। প্রতিটি আধিকারিককে নির্দিষ্ট স্কুলের দায়িত্ব দেওয়া হবে। তাঁরা প্রতিদিন একটি করে স্কুলে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় কাটিয়ে স্কুলের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন। এই পরিদর্শনের মাধ্যমে স্কুলের দৈনন্দিন কাজকর্ম, পঠন-পাঠনের পরিবেশ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বোঝার চেষ্টা করা হবে।
পরিদর্শনের প্রথম পর্যায়ে স্কুলের সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখবেন আধিকারিকরা। পড়ুয়াদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের সমস্যা, স্কুলের পরিবেশ এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না, তা জানার চেষ্টা করবেন। পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের বিষয়ে পরামর্শও দেবেন তাঁরা।
পরিকাঠামো ও আর্থিক সুবিধা খতিয়ে দেখা হবে
কোথাও শ্রেণিকক্ষের ছাদের চাঙর খসে পড়ছে কি না, স্কুলের ভবন কতটা নিরাপদ, পর্যাপ্ত শৌচালয় রয়েছে কি না এবং সেগুলি নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখবেন আধিকারিকরা। পাশাপাশি স্কুলগুলি সরকারি আর্থিক সুবিধা যথাযথ ভাবে পাচ্ছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। এই তালিকায় থাকবে কম্পোজিট গ্রান্টও। পরিদর্শনের শেষে প্রতিটি স্কুলের জন্য পৃথক রিপোর্ট তৈরি করবেন আধিকারিকরা। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে স্কুলগুলির উন্নয়নের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ করা হতে পারে।
শিক্ষকদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক, সমস্যা জানার উদ্যোগ
স্কুল পরিদর্শনের সময় প্রতিটি স্কুলে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের একটি নির্দিষ্ট সময় শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বরাদ্দ থাকবে। এই বৈঠকে স্কুলের শিক্ষকরা তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারবেন। পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, শিক্ষার মান উন্নত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন তা জানার চেষ্টা করবেন আধিকারিকরা।
অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি জনসংযোগ
স্কুল পরিদর্শনের পর আধিকারিকেরা স্কুলের আশপাশের এলাকায় গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলবেন। সরকারি স্কুল সম্পর্কে তাঁদের ধারণা, সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি না করানোর কারণ এবং স্কুলের প্রতি আস্থা ফেরাতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা জানার চেষ্টা করবেন তাঁরা। সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য তাঁদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি স্কুলের সঙ্গে অভিভাবকদের যোগাযোগ বাড়ানোর উপরেও জোর দেওয়া হবে।
ছয় মাস পর ফের পরিদর্শন, উন্নয়নের অগ্রগতি যাচাই
এই কর্মসূচি একবারের পরিদর্শনেই শেষ হবে না। প্রথম পর্যায়ে ছয় মাস ধরে স্কুলগুলিতে পরিদর্শন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার কাজ চলবে। তার পরবর্তী ছয় মাসে আধিকারিকরা ফের সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলিতে পরিদর্শনে যাবেন। প্রথম পর্যায়ে যে সমস্ত পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, স্কুলের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে কি না এবং পঠন-পাঠনের পরিবেশে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা পর্যালোচনা করা হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, সরকারি স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি স্কুলগুলির বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে তাঁদের আশা, ধারাবাহিক পরিদর্শন, পরিকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রচার কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্কুলশিক্ষার সামগ্রিক পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হবে।