মাধ্যমিকের উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা ভাবছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। সূত্রের খবর, পরীক্ষা থেকে ফলপ্রকাশের সময় আরও কমিয়ে আনতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ। সে জন্য কিছু পদক্ষেপ করা হবে। পাশাপাশি, অন্য বেশ কিছু পরিবর্তনের কথাও ভাবছে পর্ষদ।
সূত্রের খবর, মূল্যায়ন নিয়ে কড়াকড়ি চাইছেন কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক ভাবে ভাবনা চিন্তা চলছে প্রবীণ শিক্ষকদের খাতা দেখায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। ফলে নবীন শিক্ষকদের খাতা দেখার চাপ খানিকটা বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে এক একজন পরীক্ষকের কাছে অতিরিক্ত খাতা পাঠানো হতে পারে। ফলপ্রকাশের তাড়া থাকবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে মূল্যায়নের কোনও আপস চাইছেন না কর্তৃপক্ষ। সে দিকেও সতর্ক থাকার কথা ভাবছেন কর্তৃপক্ষ।
জানা গিয়েছে, খাতা রিভিউয়ের ক্ষেত্রে নয়া নির্দেশিকা আসতে চলেছে। কোনও পরীক্ষার্থী যদি খাতা রিভিউ করে এবং দেখা যায় তার অনেক নম্বর বৃদ্ধি হচ্ছে, তা হলে ডেকে পাঠানো হতে পারে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক এবং প্রধানপরীক্ষককে। তাঁদের সতর্ক করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
রাজ্য সরকারি বোর্ডের পড়ুয়াদের কাছে প্রথম পরীক্ষা মাধ্যমিক। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সব থেকে বেশি হয় এখানেই। তাই খাতা দেখার বিষয়ে এমনিতেই সতর্ক থাকতে হয় শিক্ষকদের। কিন্তু কোনও কোনও বছরে খাতা দেখার পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে অভিযোগ উঠে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরীক্ষার্থী খাতা রিভিউয়ের আবেদন করার পর বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রমাণ হয়, প্রাথমিক ভাবে খাতা দেখায় গাফিলতি ছিল। এই ত্রুটি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর সংসদ।
২০২৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয় ২ ফ্রেব্রুয়ারি, শেষ হয় ১২ তারিখে। ৯০ দিনের মাথায় ফলপ্রকাশ হয় ৮ মে। সে সময়ে একটি সূত্রের দাবি ছিল ফলাফল প্রস্তুত থাকলেও বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার জন্য কিছুটা বিলম্ব হয়। ৪ মে ছিল নির্বাচনের ফল ঘোষণা। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যেই ফল প্রকাশ হয়। কিন্তু এ বারে পর্ষদ চাইছে সেই দিনের সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে আনতে। অর্থাৎ পরীক্ষার পরে দ্রুততার সঙ্গে ফলপ্রকাশ করতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ।
হিসেব মতো মে মাসের প্রথম থেকেই একাদশের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। তার আগে ফল প্রকাশ করে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পারলেই যথা সময়ে একাদশের ক্লাস শুরু করা যাবে। সেই ভাবনা থেকেই পদক্ষেপ করতে চাইছে পর্ষদ।
তবে দ্রুততার সঙ্গে ফলপ্রকাশ হলেও উত্তরপত্রের মূল্যায়নে যেন কোনও খামতি না থাকে সে দিকে নজর দিতে চাইছেন পর্ষদের কর্তারা। অবসরের কাছাকাছি যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের পরিবর্তে বয়সে নবীন শিক্ষকদের বেশি খাতা পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে। পর্ষদ সূত্রে জানা গিয়েছে সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ হাজার শিক্ষককে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক একজন শিক্ষক সাধারণত দু’টি প্যাকেট উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকেন। একটি প্যাকেটে থাকে প্রায় ৭০টি খাতা। ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লক্ষ। তাই পড়ুয়ার সংখ্যার উপরে নির্ভর করে পরীক্ষক এবং এক একটি প্যাকেটে খাতার সংখ্যার হেরফের হয়।
পর্ষদ চাইছে, প্রয়োজনীয় শিক্ষকদেরই এই কাজে যুক্ত করা হবে। সংখ্যায় বেশি থাকবেন নবীন শিক্ষকেরা। তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। দ্রুত এবং নির্ভুল উত্তরপত্র যাচাইয়ের পাওয়ার পরেই ফলপ্রকাশ করতে চান তাঁরা। পর্ষদের এক কর্তা জানান, উত্তরপত্র রিভিউ যে কোনও পরীক্ষার্থী করতে পারে। কিন্তু যদি দেখা যায়, রিভিউ করে ১০ বা তার বেশি নম্বর বৃদ্ধি পাচ্ছে তা হলে বুঝতে হবে মূল্যায়ন সঠিক হয়নি। যদি ওই পরীক্ষার্থী রিভিউ না করত তা হলে ওই বাড়তি প্রাপ্য নম্বর পাওয়া থেকে সে বঞ্চিত হত। তাই রিভিউ করার পরে যদি অতিরিক্ত নম্বর বৃদ্ধি পায়, তা হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষককে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
পর্ষদের সভাপতি লালু দাস বলেন, ‘‘উত্তরপত্র মূল্যায়ন স্বচ্ছ ও যথাযথ করার জন্য নানা পরিকল্পনার করা হচ্ছে। আশা করি সকলে সাহায্য করলে দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুল ভাবে ফল প্রকাশ করতে পারব। সাধারণ পড়ুয়া ও অভিভাবকের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। তা মাথায় রেখেই সকলে কাজ করব।’’
এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তথা মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক স্বপন মণ্ডল। তবে ফলে শিক্ষকদের দমন পীড়ন করা যাবে এমন কোনও নীতি যেন চালু না হয় সেটাও মনে রাখা প্রয়োজন বলে তাঁর দাবি। একই ভাবে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ (বিদ্যালয়) রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক তথা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অ্যাডহক কমিটির সদস্য বাপি প্রামাণিক বলেন, ‘‘পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য পর্ষদের নানা ভাবনা রয়েছে। আমাদের সকলেরই উদ্দেশ্য সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা যেন ফিরে আসে সেই ব্যবস্থা করা।’’