Advertisement
E-Paper

বাঁচার প্রবল ইচ্ছা ছিল, আরও কাজ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রযোজকেরা সে ভাবে এগিয়ে এলেন না

রাজা সেনের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। একসঙ্গে বহু কাজ করেছেন। ভালবাসতেন অভিভাবকের মতো। পরিচালকের স্মৃতিতে কলম ধরলেন অভিনেত্রী।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৬ অগস্ট ২০২৬ ১৭:০০
রাজা সেনের স্মৃতিচারণায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

রাজা সেনের স্মৃতিচারণায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে। দারুণ মানুষ ছিলেন রাজাদা। আমার সঙ্গে অনেক কাজের অভিজ্ঞতা। ‘দেবীপক্ষ’, ‘খাঁচা’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘মায়ামৃদঙ্গ’— অনেক ছবি করেছি। কী অপূর্ব একটা মানুষ ছিলেন। ওঁর মধ্যে একটা স্থিরতা ছিল। ওঁর সবচেয়ে বড় ইউএসপি ছিল, কোনও ছবি জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে, সেই গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থটা সুন্দর করে বের করে আনতেন। মনে হত যেন ছবি আঁকছেন। এটা অভিনয়, এটা পারফরম্যান্স— এই বিষয়টাকে স্পষ্ট না করে সবটাই খুব সাধারণ, স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশ করতেন। রাজাদার একটা অদ্ভুত শৈল্পিক ও সৃজনশীল বোধ ছিল, সেটা কতটা সুন্দর, তার মূল্যায়ন করার মতো ক্ষমতা আমার নেই।

তবে রাজাদা তাঁর যোগ্য সম্মান পেলেন না। সেটা একটা বড় আক্ষেপ। এত ভাল ভাল কাজ উপহার দিয়েছেন, এতগুলো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। তবু ওঁর একটা ক্ষোভ ছিল। চাইতেন, ওঁর কাজ আরও সমাদৃত হোক। আরও ভাল প্রযোজকেরা ওঁর সঙ্গে কাজ করতে পারতেন। সেটা কিন্তু প্রযোজকেরা করলেন না। অথচ রাজাদা খুব বিচক্ষণ, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, গভীর ভাবে সম্পর্ক নিয়ে ছবি বানিয়েছেন। আমার মনে হয়, দেশ বা জাতি, ওঁকে আরও একটু সম্মান দিতে পারত।

আমাকে যে রাজাদা কতটা স্নেহ করতেন, তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। শেষ দিনও যখন হাসপাতালে দেখতে গেলাম, বলছিলেন, “তুমি কেন এসেছ? মাস্ক পরো। কেন চলে এলে হাসপাতালে দেখতে?” এতটাই চিন্তা করতেন। আমি গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম। তখন হাত ধরে বলছেন, “বেরিয়ে এসেই কিন্তু কাজটা করব।” আমরা একটা দারুণ চিত্রনাট্য তৈরি করছিলাম, একসঙ্গে কাজ করব বলে। দারুণ একটা গল্প ভেবেছিলেন আমাকে নিয়ে। সেই নিয়ে কথা হল। পাপিয়াদির (সেন) সঙ্গে সারাক্ষণ যোগাযোগে থাকি। আজীবন থাকব। ওঁর সঙ্গেও অনেকগুলো কাজ করলাম সম্প্রতি।

রাজা সেন পরিচালিত ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনীত ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ছবির পোস্টার।

রাজা সেন পরিচালিত ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনীত ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ছবির পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত।

ওঁর কাছে একটা খুব ভাল মন ছিল। এখনকার পরিচালকদের মতো বাণিজ্যিক ছিলেন না। রাজাদার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল, মানুষকে ভালবেসে কাজ করার প্রবণতা ছিল। স্নেহ দেওয়ার মানুষ, অভিভাবকের মতো ভালবাসার মানুষ, আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার মানুষ আর রইল না। হারিয়ে ফেললাম। ওই অসুস্থ অবস্থাতেও ধমক দিলেন, কেন এসেছি! এটুকুই বা আজকে ক’জন বলে? মা চলে যাওয়ার পরে খুব দুঃখ করেছিলেন।

পিজি-তে নিয়ে যাওয়ার পরেই অবস্থা আরও খারাপ হল। একটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হল। সে দিনও দেখতে গিয়েছিলাম আইটিইউ-তে। বেশি কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিল না। অনেক বার ‘রাজাদা রাজাদা’ বলে ডাকলাম। একটু মনে হল তাকানোর চেষ্টা করেছিলেন। বড্ড বাঁচার ইচ্ছা ছিল মানুষটার। অনেক কাজ করারও ইচ্ছা ছিল। বার বার বলছিলেন, “আমি ফিরে আসব। ভাল হয়ে যাব। কয়েকটা দিন লাগবে।” ৭০ বছর এমন কিছু বয়সই না এখন। দুঃখ একটাই, আরও ভাল কাজ করতে পারতেন। বোধ হয়, মানসিক ভাবেও খানিক ভেঙে পড়েছিলেন রাজাদা। আসলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে তো এখন অন্য ভাবে কাজ হয়। ভাল মানুষের সে ভাবে মূল্যায়ন হয় না। সকলেই যেন টাকাপয়সার পিছনে ছুটছে। সকলেই ভাল ‘প্রোপোজ়াল’ বানাতে চায়, ভাল কাজের দিকে মন নেই সে ভাবে কারও। সেই পরিস্থিতিতে ওঁর মূল্যবোধ আমাদের কাছে উদাহরণ। আজকাল তো দেখি, বেশির ভাগ নিজের স্বার্থ ছাড়া এগোয় না। কিন্তু, এই মানুষটাকে দেখেছিলাম একেবারে উল্টো।

এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনেক পরিচালক বা শিল্পী, যোগ্যতা না থাকলেও, ক্ষমতা বা যোগাযোগের জোরে অনেক কিছু পেয়ে যান। কিন্তু, রাজা সেনের মতো মানুষ, যোগ্যতার উচ্চ শিখরে থেকেও সেই মান্যতা পেলেন না। আমরা কিছু কাছের মানুষ ছিলাম, যারা ওঁর দুঃখ বুঝতাম। যতটা করা সম্ভব, চেষ্টা করতাম। কিন্তু, রাজা সেন অনেক বড় মাপের এক জন পরিচালক। ‘দেবীপক্ষ’ ছবির ওরকম কাস্টিং— ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শতাব্দী রায়, কোয়েল মল্লিক, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শ্যামানন্দ জালান— কে আনতে পারবে এক ছবিতে? আমাকে, ঋত্বিককে (চক্রবর্তী) আর পার্নোকে (মিত্র) নিয়ে ‘খাঁচা’ করেছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবীকে একজায়গায় এনেছিলেন। তাপস পাল আর আমি ‘আত্মীয় স্বজন’ করি। কী দারুণ কাস্টিং!

ওঁর সঙ্গে কাজের প্রচুর স্মৃতি। রাজাদার ছবি করতে গিয়েই তো আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হল। ‘চক্রব্যূহ’ ছবির শুটিং করতে গিয়ে কাঁচ ভেঙে মুখে পড়েছিল আমার। মুখ কেটে গিয়েছিল, সেই গজদাঁতটা ভেঙে গেল আমার। রাজাদা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, দুঃখ পেয়েছিলেন। রাজাদার ফ্লোরে ওরকম হয়েছে, কষ্ট পেয়েছিলেন খুব। হাসপাতালে গিয়ে দাঁত ঠিক করতে হল, চিকিৎসা হল, রাজাদা বসেছিলেন সারাক্ষণ। সে সব দিনও দেখেছি। আমার পারিবারিক অনুষ্ঠানে সব সময়ে রাজাদা আসতেন। সেখানে কত গল্প হত। মেসেজে কত কথা হত। কখনও কোনও কিছুতে রাগতে দেখিনি। ‘মায়ামৃদঙ্গ’-এর মতো একেবারে অন্য রকমের একটা ছবি বানিয়েছিলেন। যেমন চেয়েছিলেন, সে ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

সব শেষে এটাই বলতে পারি, রাজা সেন যে কাজ রেখে গেলেন, তা ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাতা বা সিনেমার ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনেক বড় পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তাঁর কাজগুলো যেন সুন্দর করে, যত্ন নিয়ে রাখা হয়। আমি তো উদ্যোগ নেবই। ওঁর কাজ থেকে অনেক, অনেক কিছু শেখার আছে।

Rituparna Sengupta Raja Sen

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy