উৎসবের আবহে সন্দীপ্তা সেনের কর্মজীবনে একের পর এক সাফল্য! গত ১৫ অক্টোবর হইচই-তে মুক্তি পেয়েছে ‘বীরাঙ্গনা ২’। দর্শকের ভালবাসা পাচ্ছে সেই সিরিজ়। এমনকি, ওই প্ল্যাটফর্মে পুজোয় মুক্তি পাওয়া কাজের সাফল্যের নিরিখে এই সিরিজ় প্রথম স্থানে রয়েছে। এখানেই শেষ নয়। হইচই-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে এই সিরিজ়ের প্রথম ভাগের হিন্দি সংস্করণ ‘ম্যাডাম ইনস্পেক্টর’। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ১৭ অক্টোবর মুক্তি পাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই সেটি ‘ট্রেন্ডিং’ তালিকায় নাম লিখিয়েছে। স্বভাবতই আপ্লুত অভিনেত্রী। আনন্দবাজার ডট কম-এর মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন দর্শকদের প্রতি।
এর আগেও সন্দীপ্তার ‘নষ্টনীড়’ দেখে অন্য এক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষের এত ভাল লেগেছিল যে, সেটাও হিন্দিতে তৈরি হয়। ‘সম্পূর্ণা’ নামের সেই সিরিজ়ে অভিনয় করেন সন্দীপ্তাই। দর্শক সেটাও পছন্দ করেছিলেন। ‘বীরাঙ্গনা’ও ব্যতিক্রম নয়। বাংলার বাইরে থেকে কাজের প্রস্তাব পাচ্ছেন? অভিনেত্রীর কথায়, “কতটা কী কাজ বাইরে থেকে পাব, জানি না। সেই নিয়ে ভাবছিও না। তবে হ্যাঁ, এই সাফল্যে আমরা প্রচণ্ড খুশি। আমাদের পুরো টিম ভীষণ খুশি। দ্বিগুণ মজা যাকে বলে। নেটফ্লিক্সে গোটা দেশের মধ্যে ট্রেন্ড করা, তা-ও আবার ২ বা ৪ নম্বরে! বিশাল বড় প্রাপ্তি এটা।”
গত ১৫ অক্টোবর হইচই-তে মুক্তি পেয়েছে ‘বীরাঙ্গনা ২’। ছবি: সংগৃহীত।
বাংলার দর্শক চিত্রা বসু চরিত্রটিকে খুবই ভালবেসেছেন। সন্দীপ্তার অন্য চরিত্রগুলির থেকে এটি বেশ আলাদাও বটে। অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য কী ভাবে তৈরি করেছিলেন নিজেকে? নতুন সিজ়নে কতটা ভেঙেছেন চরিত্রটাকে? সন্দীপ্তার কথায়, অ্যাকশন দৃশ্য তাঁর কাছে নতুন নয়, বরং তিনি ভালবাসেন এই ধরনের দৃশ্য। তিনি বলেন, “চিত্রা বসু প্রথম সিজ়নে সাব ইনস্পেক্টর ছিল। দ্বিতীয় সিজ়নে সে ইনস্পেক্টর। ফলে তার দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। এ বারে কথা বলার ধরনে বদল এনেছি। প্রথম সিজ়নে চিত্রার ব্যক্তিগত জীবন দেখানো হয়েছিল খুব মসৃণ, দারুণ। এ বারে সেটা একেবারেই ঘেঁটে গিয়েছে। ফলে চিত্রা বসুর ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনের টালমাটাল অবস্থা বোঝাতে একটা স্তর তৈরি করেছি। এই বারে মারপিট করতে হয়েছে অনেক বেশি। শাড়ি পরেও অ্যাকশন দৃশ্য করেছি। একতলা থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে পড়ার দৃশ্য করেছি। সম্পূর্ণটাই ‘বডি ডবল’ ছাড়া করেছি। ফলে শারীরিক পরিশ্রমের দিক থেকে হোক বা অধ্যবসায়— এই বারে খাটনি অনেক বেশি হয়েছে।” তাঁর কথায়, “সেই খাটনি এত ভাল ফল দিচ্ছে দেখে আমি আপ্লুত। এতদিন বাংলার মানুষের থেকে ভালবাসা পেয়েছি চিত্রা বসু চরিত্রের জন্য। এখন দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন কোণা থেকে যখন মানুষ মেসেজ করছেন, ভালবাসা জানাচ্ছেন, সমাজমাধ্যমে পোস্ট করছেন — সত্যিই ভীষণ ভাল লাগছে। এই সাফল্যটা অপ্রত্যাশিত ছিল।”
পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করা তো বেশ কঠিন। এর জন্য শারীরিক ভাবে ফিট থাকা অত্যন্ত জরুরি। অভিনেত্রী যোগ করেন, “আমার প্রশিক্ষক আমাকে নিয়ে খুবই খুশি ছিলেন। আমাকে যা চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল, আমি সবই করে ফেলছিলাম। ধারাবাহিকেও অ্যাকশন দৃশ্য করেছি। আমার তো মনে হচ্ছিল, আরও কঠিন কোনও স্টান্ট দেওয়া হোক, সেটাও করে ফেলতে পারব।”
‘শাড়ি পরেও অ্যাকশন দৃশ্য করেছি এই সিরিজ়ে’। ছবি: সংগৃহীত।
বাঙালি দুর্গাপুজোয় মণ্ডপে ঘুরতেই ব্যস্ত থাকেন, তা ছাড়া হয়তো প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে যান। কিন্তু, সেই সময়েই ওটিটিতে সিরিজ় মুক্তি? সন্দীপ্তার গলায় উচ্ছ্বাস স্পষ্ট, বলে চলেন, “পুজোর পরিক্রমায় গিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় আমি অভিভূত। মুক্তির প্রথম-দ্বিতীয় দিন থেকেই দেখছি লোকজন ‘বীরাঙ্গনা ২’ নিয়ে কথা বলছেন। পুজোর মধ্যেই যে মানুষ সিরিজ় দেখা শুরু করে দিয়েছেন, তা দেখে আমি আপ্লুত। কারণ, আমরা খানিক চিন্তাতেই ছিলাম যে পুজোর সময়ে মানুষ কতটা ওটিটি আদৌ দেখবেন ভেবে। কিন্তু, প্রথম দিন থেকেই আমরা ভীষণ ভাল প্রতিক্রিয়া পেয়েছি।” মানুষের ভালবাসাই সন্দীপ্তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, “আর নয়তো কাজ কেন করি! নিশ্চিত ভাবে আমরা উপার্জন করি, শৈল্পিকসত্তাকে তুষ্ট করি। কিন্তু, সবশেষে যদি দর্শকের সেই কাজ ভাল না লাগে তা হলে তো সবটাই জলে।” অভিনেত্রীর মতে, ২০০৮ সালে ‘দুর্গা’র সময় থেকে প্রতিটা কাজে মানুষ তাঁকে ভালবাসা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “দর্শকের কাছে আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।”
সন্দীপ্তার স্বামী সৌম্য মুখোপাধ্যায় প্রযোজনা সংস্থার উচ্চপদে কর্মরত। ফলে অনেকে ধরেই নেন যে, সন্দীপ্তার পক্ষে কাজ পাওয়া খুবই সহজ। এমন কথায় আর প্রভাবিত হন অভিনেত্রী? হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, “যখন স্টার জলসায় কাজ করতাম, তখন ১০ শতাংশ লোক বলত যে, ওই চ্যানেলে নাকি আমার শেয়ার আছে! আমি ছোট থেকে এ সব শুনেই বড় হয়েছি। এখন না হয় সৌম্য আমার জীবনে এসেছে, তাই ওর নাম উঠছে। কিন্তু, ওই ১০ শতাংশ লোক খারাপ কথাগুলো বললেই বোঝা যায় যে, আমি কিছু একটা ভাল কাজ করছি। তবে বাকি ৯০ শতাংশ আমাকে নিয়ে ইতিবাচক কথাই বলেন। সেটা আমি তারিয়ে উপভোগ করি।”
সমাজমাধ্যমে ট্রোল বা কটাক্ষ গায়ে মাখেন অভিনেত্রী? ছবি: সংগৃহীত।
কখনও কি মনে হয়েছে, ভাল কাজ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে? তেমনও মনে করেন না সন্দীপ্তা। যোগ করেন, “আমার হাতছাড়া হয়েছে কোনও কাজ, এমন শুনিনি। আমাকে নিয়ে যখন যে কাজ করতে চেয়েছেন, তাঁরা নিজেরাই যোগাযোগ করেছেন। অদিতিদির (পরিচালক অদিতি রায়) প্রজেক্ট হোক বা নির্ঝর (পরিচালক নির্ঝর মিত্র), ওঁরা নিজেরাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, চরিত্র কেমন জানান। অঞ্জনদার (পরিচালক অঞ্জন দত্ত) কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, ও রকম ধূসর চরিত্রে আমাকে ভেবেছিলেন। এই চরিত্রগুলিতে যে পরিচালক বা নির্মাতারা আমাকে ভেবেছেন, তাঁদের আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ, তাঁরা আমাকে বিশ্বাস করে, আমার কাজ ভালবেসে চরিত্রগুলি দিয়েছেন। বাকি লোকজন কী ভাবল, তাতে আমার আর কী এসে গেল!”
তা হলে সমাজমাধ্যমে ট্রোল বা কটাক্ষ গায়ে মাখেন না অভিনেত্রী? একটুও না ভেবে বলেন, “আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাল কাজ করা। যত দিন আছি এই পৃথিবীতে, শুধু ভাল কাজ করে যেতে চাই। লোকে তো বলবেই। কিশোরকুমার তো গেয়েই গিয়েছেন, ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগোঁ কা কাম হ্যায় কহেনা’। আমি ইতিবাচক দিকটা দেখি। আমাকে কত মানুষ ভালবাসছেন, আমার কাজ কত টিআরপি দিচ্ছে বা ভিউয়ার পাচ্ছে, সেটাই আমার কাছে জরুরি।”
সন্দীপ্তার সমাজমাধ্যমের পাতায় নজর রাখলেই চোখে পড়ে একাধিক ঘুরতে যাওয়ার ছবি, ভিডিয়ো। নিজেকে ‘ট্র্যাভেল এনথুসিয়াস্ট’ বলেন তিনি। প্রতি কাজের শেষেই একবার করে ঘুরে আসেন নতুন জায়গা থেকে। এ বারে কোথায় গিয়েছিলেন? প্রশ্ন শুনে গলায় উত্তেজনা স্পষ্ট। সন্দীপ্তা জানান, ২২ অগস্ট বেরিয়ে পড়েছিলেন মাসাইমারার উদ্দেশে। সেখানেই জন্মদিন পালন করেন। তিনি বলেন, “সৌম্যও ঘুরতে ভালবাসে খুব। আমরা দু’জন আর আমার ভাইবোনেরা মিলে গিয়েছিলাম। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে তারা এসেছিল। দারুণ ঘুরেছি। ছবি, ভিডিয়ো সব পোস্ট করব আস্তে আস্তে।”
সুযোগ পেলেই ঘুরতে যান সন্দীপ্তা-সৌম্য। ছবি: ইনস্টাগ্রাম।
ঘুরতে গিয়ে বা পুজোর সময়ে ডায়েট মানেন? “একেবারেই না। ঘুরতে যাওয়া মানে খাওয়াদাওয়াও করবই। কোথাও ঘুরতে গিয়ে সেখানকার কুইজ়িন চেখে না দেখাটাকে অপরাধ বলে মনে করি। পুজোতেও ডায়েট করি না। সবশেষে এখন ডায়েট আর যোগব্যায়াম করে সেই বাড়তি ক্যালরি ঝরিয়ে ফেলব।”
পুজোয় তাঁর সিরিজ় মুক্তি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বড়পর্দায় একাধিক বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে। তিনি কোনওটা দেখলেন? “আমি ‘একেনবাবু’ দেখেছি। বিশেষ প্রদর্শনীতেও গিয়েছিলাম। মা-বাবাকে নিয়ে আবার যাব ভেবেছি কারণ ওঁদের দেখা হয়নি।” তবে আর কোনও কাজ এখনও দেখে উঠতে পারেননি তিনি। ব্যস্ত ছিলেন নিজের অন্য কাজ নিয়ে। আপাতত ‘বীরাঙ্গনা’র সাফল্য উপভোগ করছেন সন্দীপ্তা।