শাহরুখ খানের সঙ্গে প্রথম আলাপ কেমন ছিল! সেই অভিজ্ঞতা একাধিক বার শুনিয়েছেন কর্ণ জোহর। আশির দশকের শেষ দিকে পরিচালক আনন্দ মহেন্দ্রের অফিসে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁদের। আনন্দ ১৯৮৯ সালে শিশুদের জন্য কল্পবিজ্ঞানধর্মী টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ইন্দ্রধনুষ’ তৈরি করেন। তার মাধ্যমে অভিনয়ে হাতেখড়ি হওয়ার কথা ছিল কর্ণের। অন্য দিকে, সেই একই ধারাবাহিকের একটি চরিত্রের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পরিচালকের অফিসে এসেছিলেন শাহরুখ। অভিনেতার প্রত্যাখ্যানের ধরন দেখে প্রথমে তাঁকে বেশ অহঙ্কারী বলে মনে হয়েছিল কর্ণের। যদিও পরবর্তী সময়ে আদিত্য চোপড়ার ১৯৯৫ সালের ব্লকবাস্টার রোম্যান্টিক কমেডি ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’-তে সহকারী পরিচালক, সহ-অভিনেতা এবং শাহরুখের পোশাক পরিকল্পনার দায়িত্বে কাজ করার সুবাদে তাঁদের সম্পর্ক বদলে যায়।
তবে সেই ঘটনার কিছুটা অন্য রকম বিবরণ দিয়েছেন আনন্দ। চলতি বছরের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে পরিচালক বলেন, “কর্ণ যে ভাবে ঘটনাটা বলেন, তাতে একটু মশলা মেশানো থাকে। ‘আমি সিরিয়াল-টিরিয়াল করতে চাই না!’— শাহরুখ এ ভাবে বলেননি। ওঁর স্বভাব এমন নয়।” তিনি নিশ্চিত করেন, ধারাবাহিকের মূল চরিত্র আপ্পুর বড়দাদা বালার ভূমিকায় শাহরুখকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। অভিনেতা প্রথমে রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেই চরিত্রে অভিনয় করেন অক্ষয় আনন্দ।
সে দিন আনন্দের অফিসে শাহরুখ এসেছিলেন তাঁকে জানাতে যে, ধারাবাহিকে কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, কেতন মেহতার ১৯৯৫ সালের মিউজ়িক্যাল প্যারোডি ছবি ‘ওহ্ ডার্লিং! ইয়ে হ্যায় ইন্ডিয়া’-তে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই ছবির শুটিং শেষ হতে অনেক বেশি সময় লেগেছিল। শেষপর্যন্ত শাহরুখের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি হয় রাজ কঁওয়র পরিচালিত ১৯৯২ সালের অ্যাকশন-রোম্যান্স ‘দীওয়ানা’।
পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে যশ চোপড়ার ১৯৯৩ সালের রোম্যান্টিক থ্রিলার ‘ডর’ মুক্তির পর শাহরুখ তারকা হয়ে ওঠেন। তা সত্ত্বেও আনন্দের ১৯৯৩ সালের টেলিভিশন প্রযোজনা, বসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘রজনী’-তে একটি ক্যামিয়ো চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। আনন্দের কথায়, “শাহরুখ যদি সত্যিই অহঙ্কারী হত, তা হলে ওর সঙ্গে আমার এত ভাল সম্পর্ক থাকত না। ‘ডর’ হিট হওয়ার পরেও আমরা ‘রজনী’-র জন্য গোটা একটা দিন একসঙ্গে কাজ করেছি। পরের দিন ও বান্দ্রায় নিজের বাড়িতে শুটিং করার অনুমতিও দিয়েছিল।”
শাহরুখ যখন মুম্বইয়ে আসেননি, দিল্লিতে নিজের শহরেই অভিনয়ের সুযোগ খুঁজছিলেন, তখন থেকেই আনন্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। পরিচালকের কথায়, “দিল্লিতেও আমার একটি অফিস ছিল। শাহরুখ সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত। ছেলেটিকে আমার ভাল লাগত। ও কুতুব ক্লাবের সদস্য ছিল, আমাকে বোলিং খেলতে নিয়ে যেত। রাতে পরাঠেওয়ালি গলিতে নিয়ে যেত, গাড়িতে জোরে গান চালিয়ে নিজে গাড়ির ছাদে উঠে গোবিন্দের ‘কালি আঁখে মিস ইন্ডিয়া’ গানটি গাইত।” অজয় কাশ্যপের ১৯৯৬ সালের ছবি ‘জ়োরদার’-এর জনপ্রিয় গানটির কথাই বলছিলেন পরিচালক।
শাহরুখকে ‘খুবই অকপট’ বলে বর্ণনা করেছেন আনন্দ। তাঁর মতে, অভিনেতা একই সঙ্গে বুদ্ধিমান ও মার্জিত এবং তিনি সিনেমা বোঝেন। কেরিয়ার নিয়ে শাহরুখের স্পষ্ট ধারণার একটি উদাহরণ দেন পরিচালক। তাঁর পারিবারিক বন্ধু, প্রখ্যাত পরিচালক বাসু ভট্টাচার্য এক বার শাহরুখকে একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু শাহরুখের পরিকল্পনা ছিল অন্য। তিনি নাকি বলেছিলেন, “আমি ইন্টেলেকচুয়াল ফিল্ম করতে আগ্রহী নই। ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অভিনেতা অনেক রয়েছেন। আমি তারকা হতে চাই।” আনন্দের কথায়, “সবচেয়ে ভাল বিষয় হল, ও কী করতে চায় আর কী করতে চায় না, সে বিষয়ে ওর ধারণা খুব স্পষ্ট।”
আরও পড়ুন:
বছরের পর বছর ধরে শাহরুখের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে আনন্দের। সেই সম্পর্কের স্মৃতি রয়েছে সুভাষ ঘাইয়ের ১৯৯৭ সালের রোম্যান্টিক ছবি ‘পরদেশ’-এর শুটিংয়েও। সেখানে শাহরুখের সঙ্গে একসঙ্গে ধূমপান করতেন পরিচালক। আনন্দ বলেন, “ওর মধ্যে কিছুটা আমি নিজের ছায়া দেখতে পেতাম। ও কিছুতেই মেকআপ রুমে যেত না। মহিমার শট নেওয়া হলেও, কিংবা কোরিয়োগ্রাফার আহমেদ খান জুনিয়র শিল্পীদের নিয়ে কোনও দৃশ্যের শুটিং করলেও, শাহরুখ সেটেই থাকত। সব সময় সিনেমার মধ্যেই বাঁচে ও। এই বিষয়টাই আমাকে সঙ্গে ওর সবচেয়ে বেশি মিলিয়ে দিয়েছিল।”