ধূমপান যে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, তা সকলেরই জানা। সিগারেটের প্যাকেটেও বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ছাপা থাকে। কিন্তু তা মানেন ক’জন? ধূমপায়ীরা যে সচেতন নন, তা নয়। তবে ধূমপানের নেশা ছাড়া বড়ই কষ্টকর, বড়ই কঠিন। সিগারেট ছাড়ার সহজ উপায় কী কী হতে পারে, সে নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি করলে নানা উত্তর পাওয়া যাবে ঠিকই, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে মেনে চলা কঠিন। সিগারেট ছাড়ার পর যে অস্থিরতা শরীরে ও মনে আসে, তাকে কব্জা করাও সকলের পক্ষে সহজ নয়। তাই ধূমপানের নেশা ছাড়তে হলে, এমন উপায় বেছে নিতে হবে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। অর্থাৎ, নেশা ছাড়াও সহজ হবে আর আসক্তিও কমে যাবে ধীরে ধীরে। পাশাপাশি, শরীর ও মনের অস্থিরতাও দূর হবে।
সেই উপায়টি হল যোগাসন। আসন অভ্যাসে ওজন কমে, অসুখবিসুখ দূরে থাকে, মন ভাল থাকে তা জানা আছে। তবে ধূমপানের নেশাও যে ছাড়া যায়, সে দাবি করেছে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এমস)। তাদের অধীনস্থ সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ এবং সেন্টার ফর কমিউনিটি মেডিসিনের গবেষকেরা একটি সমীক্ষা চালিয়েছেন। তাতে দাবি করা হয়েছে, নিয়মিত যোগচর্চা করলে ধূমপান বা তামাকের নেশা ছাড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পরে তৈরি হওয়া উদ্বেগ বা শারীরিক অস্থিরতা, বিষণ্ণতা কমাতেও যোগাসনের ভূমিকা অনেক। ধূমপায়ীদের যোগাসন করিয়ে সুফল পাওয়া গিয়েছে বলেও দাবি করেছেন গবেষকেরা।
ধূমপান ছাড়তে কেন উপযোগী হতে পারে যোগাসন?
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, যোগাসন করলে মনের চাপ কমে, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তামুক্ত হওয়া যায়। তাই যোগাসন করলেই যদি মন হালকা থাকে, তা হলে ধূমপান করার প্রয়োজনীয়তা কমবে। তা ছাড়া তামাক বা নিকোটিনের নেশা ছাড়ার সময় শরীরে ও মস্তিষ্কে যে ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যোগব্যায়াম সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
আরও পড়ুন:
নিকোটিন মস্তিষ্কে কৃত্রিম ভাবে ‘ডোপামিন’-এর ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। সিগারেট ছাড়লে ডোপামিনের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়, যে কারণে শরীরে অস্বস্তি হয় ও ধূমপান করার তীব্র ইচ্ছা জাগে। যোগাসন ও প্রাণায়াম প্রাকৃতিক উপায়ে মস্তিষ্কে ডোপামিন, সেরোটোনিন ও এন্ডোরফিন হরমোনের ক্ষরণ বৃদ্ধি করে, যা আনন্দ ও ভাল লাগার অনুভূতি দেয়। ফলে নিকোটিনের অভাব পুষিয়ে যায়।
যোগাভ্যাস মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’-কে সক্রিয় রাখে। মস্তিষ্কের এই অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে। তাই সঠিক নিয়মে যোগাসন করলে নিজের ইচ্ছা ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় অনেকটাই। দীর্ঘদিন ধূমপান করার ফলে ফুসফুসে যে কার্বন ও টক্সিন জমে, নির্দিষ্ট কিছু যোগাসন ও প্রাণায়াম তা দূর করতে সহায়ক হয়। যোগাসন করলে ফুসফুসের বায়ুথলিগুলির কর্মক্ষমতা বাড়ে, ফলে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাও দূর হয়।
ধূমপান ছাড়তে কোন কোন যোগাসন করবেন?
প্রাণায়াম— অনুলোম ও বিলোম
অনুলোমের ক্ষেত্রে এক দিকের নাক বন্ধ থাকবে। প্রথমে ডান দিকের নাকের ছিদ্র চেপে ধরে, বাঁ দিক দিয়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার কাজ করতে হবে। পরে বাঁ দিকের নাকের ছিদ্র চেপে ধরে, ডান দিক দিয়ে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে হবে। এই প্রাণায়ামে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হবে তিন ধাপে।
বিলোমের বেলায় দুই নাসারন্ধ্র দিয়েই একসঙ্গে শ্বাস টানতে হবে। প্রথমে কিছুটা শ্বাস নিয়ে দু’সেকেন্ড থামতে হবে। আবার শ্বাস নিতে হবে। ফের দু’সেকেন্ড থেমে শেষ ধাপে পুরো শ্বাস নিতে হবে। ছাড়তেও হবে একই পদ্ধতিতে থেমে থেমে তিন ধাপে।
পদ্ম-মৎস্যাসন
ম্যাটের উপর চিত হয়ে শুয়ে দুই পা টানটান করে রাখুন। দুই হাত থাকবে পাশে। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। ওই ভাবে শুয়ে থেকেই দুই পা মুড়ে পদ্মাসনের ভঙ্গি করতে হবে। ডান পা বাঁ ঊরুর উপর এবং বাঁ পা ডান ঊরুর উপর রাখতে হবে। পিঠ সামান্য তুলে ধনুকের মতো ভঙ্গি করতে হবে। এর জন্য কনুই, নিতম্ব ও মাথায় ভর দিয়ে পিঠ তুলতে হবে। পায়ের ভঙ্গি বদলালে চলবে না, পা কিন্তু পদ্মাসনের ভঙ্গিতেই থাকবে। দুই হাত দিয়ে দুই পায়ের বুড়ো আঙুল টেনে ধরতে হবে। ওই ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে হবে।
ভুজঙ্গাসন
উপুড়ে হয়ে শুয়ে পড়ুন। কাঁধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, শরীরের দু’পাশে দুটি হাত রাখুন। এ বার হাতে ভর দিয়ে দেহের উপরিভাগ তুলে ধরুন। কিন্তু কোমর থেকে পায়ের অংশ মাটির সঙ্গে ঠেকে থাকবে। এই অবস্থানে ৩০ সেকেন্ড থাকুন। ৩ থেকে ৪ বার অভ্যাস করুন।
উষ্ট্রাসন
প্রথমে ম্যাটের উপর হাঁটু মুড়ে বসুন। এ বার পিছনের দিকে খানিকটা হেলে হাত দু’টি দিয়ে গোড়ালি ধরুন। মাথা পিছনের দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে পেটের অংশ সামনের দিকে এগিয়ে দিন। এ বার দুই হাত মাটিতে রাখুন, তালু মেঝে স্পর্শ করে থাকবে। আসনটি করার সময় স্বাভাবিক ভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নিন। ২০-৩০ সেকেন্ড থেকে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন।