দু’টি রুটি, একবাটি ডাল, স্যালাড, একটি সেঁকা পাঁপড়, ঝাল আচার— অবশ্যই এক ঝলকে স্বাস্থ্যকর খাবার। কিন্তু তা ডায়াবিটিস এবং কিডনি বান্ধব কি? ঘরোয়া খাবারে অস্বাস্থ্যকর কিছুই নেই। কিন্তু ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং একইসঙ্গে কিডনির সমস্যা থাকলে, তা আর স্বাস্থ্যবান্ধব থাকে কি?
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে কিডনির প্রতি বাড়তি যত্নশীল হওয়া উচিত। দু’টি সমস্যা একসঙ্গে থাকলে, তার হাত ধরাধরি করে আসতে পারে কিডনির অসুখ। কিডনি এমন একটি প্রত্যঙ্গ যা বিগড়ে গেলে প্রভাব পড়ে সমগ্র শরীরে। কিন্তু মুশকিল হল, কিডনির সমস্যা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে না পৌঁছলে অনেক সময় রোগী টের পান না। কোনও উপসর্গ না থাকায় সচেতনও হতে পারে না। ফলে নিঃশব্দেই বাসা বাঁধে কিডনির অসুখ বা কিডনির ক্ষতি হতে থাকে।
আরও পড়ুন:
ধূমপান, মদ্যপান, ব্যথানাশক ওষুধ তো বটেই, দৈনন্দিন খাবারের ছোটখাটো ভুলভ্রান্তিতেও নিঃশব্দেই কিডনির ক্ষতি হতে পারে। তেলঙ্গনা নিবাসী পুষ্টিবিদ অপেক্ষা একবটে এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, কিডনি ভাল রাখার জন্য পরিচিত খাদ্যভ্যাস ছাড়তে হবে না বা কঠোর ডায়েট পালন করতে হবে না। ডায়াবিটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি কিডনি ভাল থাকে, এমন খাবারগুলি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি বাদ দিতে হবে, কিডনির পক্ষে ক্ষতিকর খাবার।
কমাতে হবে নুন
সোডিয়াম শরীরের জন্য জরুরি তবে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর। বেশি নুন খেলে যেমন রক্তচাপে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে, তেমনই তা কিডনির ক্ষতি হতে পারে। পুষ্টিবিদের কথায়, সচেতন ভাবে রান্নায় নুন কম দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে পাঁপড় এবং আচার খাওয়ার অভ্যাস বহু পরিবারেই রয়েছে, তার কী হবে? পাঁপড় এবং নোনতা আচারও কিন্তু প্রতিদিন শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে নুনের জোগান দেয়। আবার সান্ধ্য চায়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর বলেই অনেকে পাঁপড় খান, কেউ নুন দেওয়া বাদামও খান, খেতে ভাল লাগে বলে। আদতে স্বাস্থ্যকর হলেও, এই ধরনের খাবার নিয়মিত খেলে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য তা ক্ষতিকর হতে পারে। আবার রক্তচাপ বাড়লে তার প্রভাব পড়বে হৃদ্যন্ত্র থেকে কিডনিতেও। কিডনির কাজ, রক্ত থেকে দূষিত পদার্থ ছাঁকা। এ জন্য যে সমস্ত ছোট ছোট রক্তনালি রয়েছে, রক্তচাপ বাড়লে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেগুলি। তার ফলে কিডনিও তার কাজ করতে বেগ পাবে।
সেই কারণেই, আচার, পাঁপড় শুধু নয়, যে সব খাবারের নুনের মাত্রা বেশি, সেগুলি এড়িয়ে যেতে হবে পরামর্শ পুষ্টিবিদের। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারও কিডনির পক্ষে ভাল নয়, বাদ দেওয়া দরকার সেগুলি।
প্রোটিন খাওয়া কি কমিয়ে দিতে হবে?
শরীর ভাল রাখতে কেউ বলেন প্রোটিন খাওয়া দরকার, কেউ আবার পরামর্শ দেন প্রোটিন বেশি না খাওয়ার কারণ, তাতে না কি কিডনির ক্ষতি হয়। পুষ্টিবিদ বলছেন, কতটা প্রোটিন খাবার খেতে হবে তা ব্যক্তি বিশেষের স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। কিডনির বর্তমান অবস্থা কী, তার উপর প্রোটিন খাবারের মাত্রা নির্ভর করবে। তা ছাড়া, প্রত্যেকের শরীরের প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা আলাদা। সবটা বুঝেই একজন চিকিৎসক বলতে পারবেন, কোনটি খাওয়া যাবে, কতটা খাওয়া যেতে পারে। পুষ্টিবিদের কথায়, প্রোটিনের মাত্রার ব্যাপারে কোনও সর্বজনীন নির্দেশিকা দেওয়া যায় না। তা ব্যক্তি বিশেষের শরীর, কায়িক শ্রমের উপর নির্ভর করে।
ভাত, রুটি, ডাল
ভাত, রুটি, ডাল কতটা খাওয়া দরকার তা নির্ভর করছে ব্যক্তিবিশেষের শরীরের উপর। শর্করার মাত্রা বুঝে। ভাত, রুটি খেতে হবে পরিমিত। সেই জায়গা বেশি পরিমাণে স্যালাড এবং সব্জি খাওয়া যেতে পারে। আবার প্রোটিনের জন্য ডাল, মাছ, মাংস রয়েছে। কিন্তু কতটা খেতে হবে তা ব্যক্তি বিশেষের ওজন, প্রয়োজনের উপর নির্ভর করবে।
পরীক্ষা
উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবিটিস থাকলে, প্রথমেই তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পাশাপাশি কিডনির পরীক্ষা করানোও জরুরি। উপসর্গের জন্য অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের নির্দেশে বছরে বা ছ’মাসে একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি। দেশ জুড়ে ক্রমশই বাড়ছে কিডনির অসুখে আক্রান্তের সংখ্যা। ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সংক্রান্ত সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি সম্প্রতি একটি রিপোর্টে জানিয়েছে উদ্বেগের কথা। বছরে দু’বার ‘কিডনি ফাংশনিং টেস্ট’ করানোর পরামর্শ দিচ্ছে তারা। এটি হল কিডনির কার্যকারিতা প্রমাণের পরীক্ষা। এতে সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা হয়। রক্ত পরীক্ষায় ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখা হয়। ক্রিয়েটিনিন বেশি থাকলে বোঝা যায়, কিডনি সুস্থ নেই। তবে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বয়স এবং আরও নানা কারণে বাড়তে পারে। তাই জোর দেওয়া হয়েছে ইজিএফআর (এস্টিমেটেড গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট) নামে আরও একটি পরীক্ষায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, কিডনি কতটা রক্ত পরিশোধন করছে।