বাইরে থেকে খানিকটা রুটির মতোই, তবে মোটা এবং ফোলা। কামড় বসালেই মিলবে পুরের স্বাদ। গরম এবং নরম কুলচার স্বাদ অনবদ্য। কুলচা, মশলাদার ছোলে, আচার আর এক গ্লাস লস্যি— ভোজনরসিকদের কাছে শুধু পেট ভরানোর নয়, মন ভরানোর খাবারও। ভারতের এক শহর, যা ‘কুলচা রাজধানী’ বলে পরিচিত। আসলে কোথাও কোথাও কুলচা শুধু লোভনীয় খাবার নয়, বরং সেই স্থানের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের অংশ।
ভারতের নানা প্রান্তেই কুলচা মেলে। তবে স্বাদে বৈচিত্র রয়েছে। উত্তর ভারতের নরম কুলচা, দিল্লির চেনা কুলচে-ছোলার চেয়ে এটি একেবারেই আলাদা। দিল্লি এব অমৃতসর, দুই জায়গাতেই কুলচা জনপ্রিয় হলেও, ভারতের ‘কুলচা রাজধানী’ বলে পরিচিতি পেয়েছে পঞ্জাবের অমৃতসর।
এই শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে ছোট-বড় বাজার, রেস্তরাঁ—সব জায়গাতেই কুলচা মেলে। বাড়িতেও তৈরি করা হয় কুলচা। প্রাতরাশ হোক কিংবা মধ্যাহ্নভোজ, অমৃতসরের কুলচা সবেতেই বাজিমাত করতে পারে। এমনকি ভারত সরকারের ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’ পর্যটন পোর্টালেও অমৃতসরের খাদ্যতালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে কুলচাকে।
অমৃতসরি কুলচার বিশেষত্ব কী?
তন্দুরে তৈরি: মাটির তন্দুরে সেঁকা হয় বলে, ফলে মাটির পোড়া গন্ধ মিশে যায় কুলচায়। মাটির তন্দুরে কম তাপমাত্রায় তা সেঁকা হয়। কুলচা উপর থেকে মুচমুচে থাকে, ভিতরে হয় নরম। মাখন মাখানো কুলচা কোনও তরকারি ছাড়াই খাওয়া যায়।
পুর: কুলচার ভিতরে থাকে মশলাদার আলুর পুর (স্টাফিং)। মাটির তন্দুরে ভাল করে সেঁকার পর উপর থেকে মাখিয়ে দেওয়া হয় প্রচুর মাখন বা ঘি। কোথাও কোথাও পেঁয়াজ এবং পনিরের পুরও ভরা হয়।
পরিবেশন: অমৃতসরে কুলচার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় গরম মশলাদার ছোলে, চাটনি এবং পেঁয়াজের আচার। লস্যিও খাওয়া হয় এর সঙ্গে। কোথাও কোথাও কুলচা দুহাত দিয়ে চেপে ভিতরের বাষ্প বার করে কুলচা পরিবেশন করা হয়। এতে স্বাদ আরও ভাল ভাবে বোঝা যায়।
কী ভাবে এটি এত জনপ্রিয় হল?
অমৃতসরে প্রাতরাশ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন খাবারেই কুলচা খাওয়ার চল। ছবি:সংগৃহীত।
অনেকে বলেন, অমৃসসরের সঙ্গে কুলচার যোগসূত্র ২০০ বছরের বেশি পুরনো।খাদ্যসংস্কৃতির চর্চাকারীদের মতে, কুলচার ইতিহাস মধ্য এশিয়ার রুটি এবং তন্দুর রান্নার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। অনেকের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের খামিরি রুটি থেকেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় রন্ধনশিল্পীদের হাত ধরে জন্ম নিয়েছে আজকের এই পুরভরা কুলচা। ধীরে ধীরে তা অমৃতসরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। শহরের প্রতিটি পাড়াতেই রয়েছে কুলচার নিজস্ব পরিচিত দোকান।
অনেকের মতে, অমৃতসরি কুলচার ইতিহাস মোগল আমলের সঙ্গে জড়িত। মোগল সম্রাট শাহজাহানের রসুইখানার বাবুর্চিরা এক বিশেষ ধরনের পুর ভরা রুটি তৈরি করতেন, যা সম্রাটকে পরিবেশন করা হত। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর এবং মহারাজ রঞ্জিত সিংহের আমলে এই রন্ধনশিল্পী বা বাবুর্চিদের একটি বড় অংশ পঞ্জাব অঞ্চলে চলে আসেন। অমৃতসরে তাঁরা তন্দুরের সাহায্যে স্থানীয় মশলা ও মাখন ব্যবহার করে এই রুটিকে এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেন, যা আজকের ‘অমৃতসরি কুলচা’ নামে পরিচিত।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রেস্তরাঁ, এমনকি বিদেশের মাটিতেও অমৃতসরি কুলচা পাওয়া যায়। তবে খাদ্যরসিকদের মতে, আসল, মাখনে মাখা কুলচার স্বাদ পেতে হলে এক বার অমৃতসরের মাটিতেই পৌঁছতে হবে।
জিআই ট্যাগের উদ্যোগ
পঞ্জাব খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বিভাগ অমৃতসরের কুলচার জন্য জিআই ট্যাগ পেতে আগ্রহী। বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছে। জিআই ট্যাগ কোনও অঞ্চলের বিশেষ ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ভৌগোলিক স্বীকৃতির প্রমাণ দেয় (যেমন-কলকাতার রসগোল্লা, দার্জিলিং চা)। এই স্বীকৃতি পেলে বিশ্বজুড়ে অমৃতসরি কুলচার বিশেষত্ব প্রচার সহজ হবে, রফতানি বাড়বে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।