অপুষ্টিজনিত রোগে এ দেশের অনেক শিশু ভুগছে, সমীক্ষায় এমন ধরা পড়েছে বহু বার। তবে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা এই ধারণা বদলে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) একটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, পুষ্টির চরম বৈপরীত্যে ভুগছে এ দেশের অনেক শিশু। দেখা যাচ্ছে, জন্মের সময়ে বা পরে তাদের ওজন স্বাভাবিকের থেকে কম থাকছে, কিন্তু ৭ বছর বয়সের পর থেকেই ওজন বাড়তে শুরু করছে। বয়স ৯ বছর হতে না হতেই দেখা দিচ্ছে স্থূলত্ব। জন্মের সময়ে শীর্ণকায় শিশুটিও কৈশোর পার হতে না হতেই স্থূলত্বের শিকার হচ্ছে। ‘দ্য ল্যানসেট’ মেডিক্যাল জার্নালেও এই সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে লেখা হয়েছে।
টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চও শিশুদের অপুষ্টিজনিত রোগ ও স্থূলত্ব নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, নানা রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও মফস্সলগুলিতে শিশুদের উপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে। জন্মের সময় থেকে ৯ বছর বয়স অবধি পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা গিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই স্থূলত্বের সমস্যায় ভুগছে। শুধু তা-ই নয়, বাড়তি ওজনের কারণে ছোট থেকে টাইপ ১ ডায়াবিটিসের সমস্যাও হচ্ছে শিশুদের।
কৈশোরে স্থূলত্বের কারণ কী?
শিশুদের ৭ থেকে ৯ বছর বয়সে বিপাকীয় হার বা মেটাবলিজ়মে বড়সড় বদল আসে। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ওই বয়সের বেশির ভাগ শিশুই জাঙ্ক ফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে অভ্যস্ত। এমনকি, বাবা-মায়েরাও ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে ছোটদের হাতে প্রক্রিয়াজাত খাবার ধরিয়ে দিচ্ছেন। তেমন খাবার হজম করার মতো ক্ষমতা ওই বয়সে শিশুর তেমন ভাবে থাকে না। ফলে খাবারের বাড়তি ক্যালোরি শোষিত হয় না ও তা খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে শরীরে জমতে শুরু করে, যা পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ওজনের কারণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:
আরও একটি কারণ হল, মোবাইলে অতিরিক্ত আসক্তি। শিশুর মন রাখতে ছোট থেকেই হাতে মোবাইল, ট্যাব ধরাচ্ছেন অভিভাবকেরা। ফলে ছোটরা এখন বাইরে বেরিয়ে খেলাধূলার বদলে ঘরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল বা ট্যাব নিয়ে বসে আছে, যা স্থূলত্বের অন্যতম কারণ।
অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া ও কম কায়িক পরিশ্রমের কারণে হজমশক্তি দুর্বল হচ্ছে শিশুদের। ছোট থেকেই গ্যাস-অম্বলের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই কারণে বিপাকক্রিয়াজনিত অসুখ ‘মেটাবলিক সিনড্রোম’ হানা দিচ্ছে ছোট থেকেই। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার শিশু ও কমবয়সিরা সবচেয়ে বেশি মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত। এই রোগ হলে পেট ও তলপেটে মেদ জমতে শুরু করে। সঙ্গে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) দেখা দিতে থাকে। এই দশাকে বলে ‘ট্রাঙ্কাল ওবিসিটি’। চিকিৎসকেরা বলছেন, মেদ তো কেবল বাইরে জমে না, পাকস্থলীর ভিতরেও জমে। তখন অগ্ন্যাশয়ে চাপ পড়তে থাকে। ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণও বেড়ে যায়। ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
‘ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশন’-এর তথ্য বলছে, ভারতে ৫ থেকে ৯ বছর এবং ১০ থেকে ১৯ বছরের শিশু ও কমবয়সিদের মধ্যে স্থূলত্বের হার সবচেয়ে বেশি। ওজন যে ভাবে বেড়ে চলেছে ছোটদের, তাতে আগামী দিনে আরও বড় বিপদ আসতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। গবেষকদের আশঙ্কা, শৈশবে মেদবাহুল্য ও মাত্রাতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি এ দেশের জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠবে। ২০৪০ সালের মধ্যে এ দেশের অন্তত ১২ কোটি শিশু ও কমবয়সিরা স্থূলত্বজনিত নানা রোগের শিকারও হবে। তার মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, মেটাবলিক সিনড্রোমজনিত লিভারের জটিল অসুখ, কিডনির রোগ এবং থাইরয়েডের মতো অসুখ। তাই সতর্ক না হলেই বিপদ।