ধূমপান বলতে প্রথমেই মনে আসে ফুসফুসের ক্যানসার বা হাঁপানির কথা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, নিয়মিত বিড়ি বা সিগারেট খেলে বা তামাকজাত দ্রব্যের নেশা করলে মেয়েদের শরীরে এমন কিছু মারাত্মক রোগ বাসা বাঁধে, যা নিয়ে ধারণাই নেই বেশির ভাগেরই। এই সব রোগের লক্ষণও এমন, যা সাধারণ বলেই ভ্রম হয়। অনেকেই একে গ্যাস-অম্বল, ক্লান্তি বা বয়সজনিত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যলয়ের গবেষণা বলছে, তামাকের নিকোটিন মহিলাদের ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের উপরে প্রভাব ফেলে বেশি। এর মধ্যে ইস্ট্রোজেন হরমোনের তারতম্য বেশি হয়। এই হরমোনটিই মহিলাদের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। তার মধ্যে প্রজননও রয়েছে। কাজেই ধূমপান কিন্তু পরোক্ষে প্রজনন স্বাস্থ্যের উপরেও প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি, ক্ষতি করে হার্ট ও স্নায়ুর।
ধূমপানে মহিলাদের কোন কোন রোগের আশঙ্কা বাড়ে?
হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া বা অস্টিয়োপোরোসিস
অস্টিয়োপোরোসিস হল এমন একটি রোগ, যেখানে হাড়ের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক ভাবে কমে যায় এবং হাড় স্পঞ্জের মতো ফাঁপা ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তামাকের নিকোটিন ও অন্যান্য রাসায়নিক ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। ইস্ট্রোজেন হাড়কে মজবুত রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তা ছাড়া তামাকের রাসায়নিক শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি শোষণে বাধা দেয়, ফলে হাড় দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে। আরও একটি ব্যাপার ঘটে, তা হল, যে মহিলারা বেশি ধূমপান করেন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই সময়ের আগেই রজোনিবৃত্তির লক্ষণ দেখা দেয়। ফলে অস্টিয়োপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে কমবয়সেই।
আরও পড়ুন:
লক্ষণ চিনুন: প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ বোঝা যায় না। পিঠ বা কোমরব্যথা, সামান্য ভারী কাজ করলে হাঁটু বা পায়ে যন্ত্রণা, অল্পেই হাঁপিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি এর লক্ষণ হতে পারে। এ সব লক্ষণকে স্বাভাবিক বলেই ভ্রম হয়, ফলে রোগ বাড়তে থাকে তলে তলে।
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজ়িজ় বা পিএডি
সিগারেটের বা বিড়ির ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন ও কার্বন মনোক্সাইড রক্তনালির ভিতরে চর্বির আস্তরণ জমতে সাহায্য করে এবং রক্তনালিকে সরু ও শক্ত করে তোলে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ধূমপানের ফলে রক্তনালি সঙ্কুচিত হওয়ার প্রবণতা পুরুষদের চেয়েও দ্রুত ঘটে। ফলে রক্তচলাচল বাধা পেয়ে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতে থাকে। পায়ে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণও দেখা দেয়। এই রোগকে বলে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজ়িজ়। এটি হলে ত্বকের রং বদলাতে থাকে, নীলচে-বেগনি শিরা ফুটে ওঠে পায়ে। পা ফুলে যায়, হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়।
লক্ষণ চিনুন: সকলের ক্ষেত্রেই যে পায়ে নীল শিরা ফুটে উঠবে, তা নয়। তবে খেয়াল করতে হবে, অল্প হাঁটলেই পায়ে ব্যথা হচ্ছে কি না। বসে থাকার পরে পা ফুলে যাবে, হাঁটতে কষ্ট হবে। রাতে শুয়ে পা ঠান্ডা ও অসাড় হয়ে যাবে, মাঝেমধ্যেই কাফ মাসলে টান ধরবে। পায়ের খিঁচুনিও হতে পারে। একে বাতের ব্যথা বা ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা ভেবে ভুল করেন অনেকেই।
এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি
এটি খুবই মারাত্মক অবস্থা। সাধারণ গর্ভাবস্থায় নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ু গহ্বরে থাকে। কিন্তু এক্টোপিক গর্ভাবস্থায় নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ু গহ্বরের বাইরে স্থাপিত হয়। এক্টোপিক গর্ভাবস্থায় ভ্রূণটি যত বাড়তে থাকে, তত বেশি রক্তপাত হয় এবং ডিম্বনালির ক্ষতি হয়। এমনকি সঠিক চিকিৎসা না হলে অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। নিকোটিন ফ্যালোপিয়ান টিউবের স্বাভাবিক সঙ্কোচন-প্রসারণের গতি ব্যাহত করে। ফলে ডিম্বাণু জরায়ুর দিকে নামতে না পেরে টিউবের ভিতরেই আটকে থাকে এবং সেখানেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
লক্ষণ চিনুন: সন্তানধারণের প্রথম ছয় সপ্তাহের মধ্যে তেমন কোনও লক্ষণ বোঝা যায় না। কিন্তু ছয় সপ্তাহ পর থেকে যোনি থেকে রক্তপাত শুরু হতে পারে। অনেক সময়ে পেটে যন্ত্রণা হয়, মাথাঘোরা, বমি ভাব থাকে। তলপেটের এক পাশে যন্ত্রণা হতে থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে ঘাড়ে ব্যথা দেখা যেতে পারে, এই ব্যথা শোয়ার পরে বেড়ে যায়। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত ব্যথা অনুভূত হতে পারে।