‘ব্রেন’ মানে মগজ বানিয়ে ফেলল মানুষ! গবেষণাগারে। কৃত্রিম মস্তিষ্ক বেঁচে থাকল সাত বছর। মগজের কোষকে বিশেষ উপায়ে জীবন্ত রাখলেন গবেষকেরা। তার বিকাশও ঘটালেন। এই ৭ বছরের আয়ুষ্কালে মস্তিষ্কের জটিল কিছু রোগ নিরাময়ের উপায়ও পাওয়া গেল।
আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই অসাধ্যসাধন করেছেন। স্টেম কোষের বিকাশ ঘটিয়ে গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে ক্ষুদ্র মগজ তৈরি করে ফেলেছেন। মগজের যে অংশটি শব্দ শোনা, দেখা, কথা বলা, চিন্তাভাবনা করা বা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনে সাহায্য করে, তাকে বলে মগজের মধ্যাঞ্চল অথবা ‘মিড ব্রেন’। সেখানকারই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষ বা ‘ব্রেন অর্গ্যানয়েড’ তৈরি করেছেন গবেষকেরা। এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে একই ভাবে কোষে কোষে স্নায়বিক সঙ্কেতও আদানপ্রদাহ হবে। এর আগেও গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে মানব মস্তিষ্ক তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। সেই মগজ টিকে ছিল ৬৯৪ দিন। এ বার সাত বছর কৃত্রিম মগজকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন হার্ভার্ডের গবেষকেরা। এই সময়কালে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশ, অ্যালঝাইমার্স-সহ একগুচ্ছ জটিল স্নাবিক রোগের চিকিৎসার উপায়ও খুঁজে দেখা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
হার্ভার্ড স্টেম সেল ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক পাওলা আরলোটা জানিয়েছেন, সাত বছরের মেয়াদ শেষে মগজের কোষগুলিকে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে ঠিকই, তবে চাইলে আরও বেশি দিন মগজকে বাঁচিয়ে রেখে পরীক্ষা করা সম্ভব হত। এই কোষগুলি খুবই সূক্ষ্ম, বড়জোর লম্বায় দুই থেকে তিন মিলিমিটার। আসল মগজের মতো সবই ছিল এই কৃত্রিম মগজে। স্তরে স্তরে ছিল স্নায়ুকোষ, স্নায়ুতন্ত্র। মগজের কোষগুলির বিকাশ ঘটানোর জন্য ‘ডিএনএ মিথাইলেশন’ প্রক্রিয়ার প্রয়োগ করা হয়েছিল। কোষগুলিকে অক্সিজেন ও পুষ্টি জুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয় দীর্ঘ সাত বছর।
কী সুবিধা হবে এতে?
স্মৃতি কী ভাবে তৈরি হয় ও তা উন্নত করার উপায় কী, তা দেখা গিয়েছে এই পরীক্ষায়। মগজের কোষগুলিকে পর্যবেক্ষণে রেখে গবেষকেরা দেখেছেন, কী ভাবে স্মৃতি তৈরি হচ্ছে তাতে। স্মৃতি লোপ পাওয়া ঠেকাতে কী করা জরুরি, সে উপায় বার করার চেষ্টাও হয়েছে।
মগজের কোন কোন কোষের বদলে অ্যালঝাইমার্স বা পারকিনসন্সের মতো রোগ হয়, জটিল স্নায়বিক ব্যাধির কারণ কী, তা খুঁজে দেখার সুযোগ পাবেন গবেষকেরা।
মস্তিষ্কের অসুখে কোন ওষুধ কী ভাবে কাজ করে, সে প্রক্রিয়াও চোখের সামনে দেখা হয়েছে। রোগীদের দেওয়ার আগে নতুন বা সদ্য-আবিষ্কৃত ওষুধগুলিকে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়ার উপায়ও হতে পারে কৃত্রিম মগজ।
জন্মের পর থেকে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ কী ভাবে ঘটে, কী কী পরিবর্তন তাতে হয়, তা এক প্রকার রহস্যই ছিল এতদিন। কৃত্রিম মগজ তা জানার সুযোগ করে দিয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, কৃত্রিম মগজ তৈরি করে আগামী দিনে জানা সম্ভব হবে যে অটিজ়ম রোগটি কী ভাবে হতে পারে, কাদের হতে পারে, এর চিকিৎসার উপায়ই বা কী।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষ কী ভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যায়, ব্রেন অর্গ্যানয়েডের মাধ্যমে তা জানা যাবে।
ব্রেন স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় নতুন ওষুধ তৈরি করে তার প্রয়োগ সরাসরি এই কৃত্রিম মগজের উপর করা যাবে। ওষুধ কী ভাবে কাজ করছে, রোগ কী ভাবে নির্মূল হবে, সে উপায়ও বার করা যাবে সহজেই।