লোকসভায় প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী সংশোধনী বিল (পাবলিক এগ্জ়ামিনেশন—প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস—অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬) সংক্রান্ত বিতর্কের সময় বুধবার লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী অভিযোগ করেছিলেন, গত ২০ জুলাই পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে ‘ককরোচ’দের সংসদ অভিযানের সময় ছাত্রদের উপর পুলিশের ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশেই করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার একই দাবি করলেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। পাশাপাশি, রাহুলের সুরে সুর মিলিয়েই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের পদত্যাগও দাবি করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার মহারাষ্ট্রের সম্ভাজিনগরে দীপকে বলেন, “ছাত্রদের উপর যে ভাবে আক্রমণ হয়েছে, প্রতিবাদীদের রক্ত ঝরেছে, তা শাহের নির্দেশ ছাড়া হতে পারে না।”
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে শাহের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও নিশানা করেছেন ককরোচ-প্রধান। তাঁর কটাক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে মোদীর ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ (নেটপ্রভাবী) হয়ে যাওয়া উচিত। ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দেশ জুড়ে হওয়া আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের উদ্দেশে সমাজমাধ্যমে বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়েই মোদীকে কটাক্ষ করে ওই মন্তব্য করেন দীপকে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী বিলের বিরোধিতা করেছেন বিরোধী শিবির। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গের অভিযোগ, তাড়াহুড়ো করে আনা এই সংশোধনী বিল পাস বলে একটি ত্রুটিপূর্ণ আইন জন্ম নেবে।
লোকসভায় মঙ্গলবার প্রশ্নফাঁস বিরোধী বিল নিয়ে বিতর্কের সময় মাদ্রাজ আইআইটির অধ্যাপক তথা ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ (এনটিএ)-র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত টাস্ক ফোর্সের সদস্য ভি কামকোটি-কে নাম না করে ‘গোমূত্র বিশেষজ্ঞ’ বলেছিলেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরা। বৃহস্পতিবার ২১৫ জন শিক্ষাবিদ একটি খোলা চিঠিতে আইআইটির অধ্যাপক সম্পর্কে প্রিয়ঙ্কার ‘গোমূত্র’ মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার যন্তর মন্তর-কাণ্ডে দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানিয়েছে, এ বার থেকে শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী কোনও পরিস্থিতিতেই ছর্রা গুলি ব্যবহার করতে পারে পুলিশ। একই সঙ্গে কেন্দ্রকেও নির্দেশ দিয়েছে, যন্তর মন্তরে আন্দোলনের সময়ে মোতায়েন থাকা র্যাফের কাছে কী কী কার্তুজ ছিল, সেই হিসেব সংরক্ষণ করতে হবে।
ককরোচ-নিশানায় মোদী শাহ
দিল্লিতে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি হামলা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশেই হয়েছিল বলে অভিযোগ করলেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গাঁধীর সুরেই বৃহস্পতিবার শাহের ইস্তফা দাবি করেন দীপকে। দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্না-বিক্ষোভের জন্য সিজেপি বিদেশি অর্থসাহায্য পেয়েছে, এই অভিযোগও তিনি খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, ‘‘যদি সত্যিই আমরা বিদেশি অর্থ পেয়ে থাকি, আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্বে থেকেও অমিত শাহ তা আটকাতে না পারেন, তবে সেটাও তাঁরই ব্যর্থতা। তা হলে নিজেকে কি তিনি ‘চাণক্য’ বলবেন? সে ক্ষেত্রেও তো তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।’’
সেই সঙ্গে দীপকে অভিযোগ করেন, ২০ জুলাই দিল্লি পুলিশ ইচ্ছাকৃত ভাবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অজুহাত তৈরি করেছিল। তাঁর মন্তব্য, ‘‘২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থলে একটি ট্রাকে করে পাথর এবং একটি ভাঙাচোরা গাড়ি আনা হয়েছিল, যাতে পুলিশি অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা যায়। পাথর নিক্ষেপের পুরো ঘটনাই দিল্লি পুলিশ পরিকল্পিত ভাবে ঘটিয়েছে। বিজেপির লোকজন এসে পাথর ছোড়ে, অথচ দোষ চাপানো হয় ছাত্রদের উপর।’’ ছাত্রবিক্ষোভের জেরে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। তাঁদের এই আন্দোলনের সাফল্যের পর বুধবার নিজের মহারাষ্ট্রের বাড়িতে ফিরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন দীপকে। সেখানে নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকেও। সিজেপি প্রধানের দাবি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের দায়িত্ব সামলানোর বদলে মোদী সমাজমাধ্যমে নিজেকে বেশি স্বচ্ছন্দ মনে করেন। দীপকের কথায়, “আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে যাওয়া উচিত। ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তিনি ভাল কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার ছেড়ে অন্য কোনও নেতাকে দেশের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া উচিত।”
দীপকে-র অভিযোগ, আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরেও বিভিন্ন রাজ্যের সরকার আন্দোলনকারী ছাত্রদের খুঁজে বার করে হয়রানি করছে। তাঁর কথায়, “সিজেপি আন্দোলন তুলে নেওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যের সরকার আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করে হয়রানি করছে। সরকার অবিলম্বে এই হয়রানি বন্ধ করুক। না হলে আগামী নির্বাচনে আন্দোলনকারীরাই এর জবাব দেবে।” দীপকে-র দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কমেনি। এই সূত্রেই তিনি বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধানকে যে ভাবে পদত্যাগ করানো হয়েছে, তেমনই প্রয়োজনে সরকারও বদলে দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বড় পরিসরে হবে।” ছাত্রবিক্ষোভের মধ্যেই প্রশ্নফাঁস রুখতে কঠোর আইন আনার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এই আইন আনার কথা ঘোষণা করতেই সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছিলেন তিনি। শুক্রবার সমাজমাধ্যমে আরও একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেন তিনি। ওই ভিডিয়োয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ধন্যবাদ বন্ধুরা (ফ্রেন্ডস)। কাল বেশি রাতে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়ে গিয়েছিল। যে ভিডিয়ো পোস্ট করেছিলাম, তাতে আপনারা যে ভাবে সাড়া, পরামর্শ দিয়েছেন, তার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।’’ প্রধানমন্ত্রীর এই জোড়া ভিডিয়োবার্তার প্রেক্ষিতেই তাঁকে কটাক্ষ করেন দীপকে।
জোড়া বিতর্কে প্রিয়ঙ্কা-রাহুল
লোকসভায় প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী সংশোধনী বিল (পাবলিক এগ্জ়ামিনেশন—প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস—অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬) সংক্রান্ত বক্তৃতা করতে গিয়ে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা অভিযোগ করেছিলেন, পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ (এনটিএ)-র খোলনলচে বদলের লক্ষ্যে কেন্দ্রগঠিত টাস্ক ফোর্সের মধ্যে ‘গোমূত্র বিশেষজ্ঞ’ রয়েছেন। যদিও তিনি নির্দিষ্ট ভাবে কারও নাম উল্লেখ করেননি প্রিয়ঙ্কা। তবে তাঁর মন্তব্য টাস্ক ফোর্সের সদস্য তথা মাদ্রাজ আইআইটির ডিরেক্টর ভি কামকোটির উদ্দেশে করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার, প্রাক্তন উপাচার্য, বিজ্ঞানী-সহ ২১৫ জন শিক্ষাবিদ একটি খোলা চিঠিতে আইআইটির অধ্যাপক সম্পর্কে প্রিয়ঙ্কার ‘গোমূত্র’ মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
প্রসঙ্গত, পেশাগত ভাবে কামকোটি কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। আইআইটি মাদ্রাজ থেকেই কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ২০০১ সালে তিনি সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আইআইটি মাদ্রাজের ডিরেক্টর পদের দায়িত্ব নেন। কম্পিউটার আর্কিটেকচার, তথ্য সুরক্ষা এবং অতিক্ষুদ্র বৈদ্যুতিন চিপ (ভিএলএসআই) ডিজাইনে তিনি ‘দক্ষ’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২০০টি গবেষণাপত্রও রয়েছে তাঁর। বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্কের আবহে আন্দোলনকারীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি মেনে পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং এনটিএ-র আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে কেন্দ্র। ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নীলেকণি নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে কামকোটি ছাড়াও স্থান পেয়েছেন আরও চার জন। তাঁরা হলেন, তপনকুমার ডেকা (কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ বা আইবি-র প্রাক্তন অধিকর্তা), অনীতা করবাল (প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিব), অমৃতলাল মীণা (প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ) এবং এস সোমনাথ (ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইসরো’র প্রাক্তন চেয়ারম্যান)।
প্রিয়ঙ্কার মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে খোলা চিঠিতে ওই শিক্ষাবিদেরা লিখেছেন, ‘‘কোনও গবেষকের মতামতের মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্তিতর্কে না গিয়ে কেবল একটি তকমা দিয়ে তাঁকে খারিজ করে দেওয়া অনভিপ্রেত। এমন উদাহরণ আমাদের সংবিধান যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব গড়ে তোলার আহ্বান প্রত্যেক নাগরিকের প্রতি জানায়, সেটিকেই দুর্বল করার আশঙ্কা তৈরি করে।” সেই সঙ্গে বলা হয়েছে, ‘‘আপনার সেই মন্তব্য সম্পর্কে আমরা হতাশা প্রকাশ করে লিখছি। যেখানে আপনি আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক অধ্যাপক ভি কামাকোটিকে ‘গোমূত্র বিশেষজ্ঞ’ বলেছেন। তা ব্যঙ্গ বা রাজনৈতিক বক্তব্য, যে উদ্দেশ্যেই করা হয়ে থাকুক না কেন, এই ধরনের বর্ণনা এমন উদ্বেগের জন্ম দেয় যা কেবল এক জন ব্যক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়।”
অন্য দিকে, প্রশ্নফাঁসরোধী বিল নিয়ে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুলের বুধবারের বক্তৃতার ‘শব্দচয়ন’ নিয়ে আবারও সরব হয়েছে বিজেপি। মন্তব্যের জন্য রাহুলকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবিও তোলেন বিজেপি সাংসদেরা। সংসদে বক্তৃতায় রাহুল ‘তিন শ্রেণির মানুষের’ কথা উল্লেখ করেন— পড়ুয়া, বোকা (ইডিয়ট্স) এবং অন্ধভক্ত। লোকসভার বিরোধী দলনেতার এ ধরনের শব্দ ব্যবহারে আপত্তি তোলেন এনডিএ-র সাংসদেরা। বক্তৃতার সময় রাহুল নিট আন্দোলনের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এক ১৮ বছর বয়সি পড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের কথা স্মরণ করেন। সেই পড়ুয়া তাঁকে বলেছেন, ‘‘অন্ধভক্ত হলেন এমন এক জন, যিনি পুরোপুরি মেনে নেন যে, অন্য এক ইডিয়ট্ই ভগবান।’’ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার নির্দেশে রাহুলের বক্তৃতার ‘অসংসদীয় শব্দ’ লোকসভার কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হলেও অনড় অবস্থানে ট্রেজারি বেঞ্চ।
প্রশ্নফাঁস বিলে বিতর্ক রাজ্যসভায়
লোকসভার পরে এ বার রাজ্যসভায় প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী বিলের বিরোধিতা করেছে বিরোধী শিবির। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের অভিযোগ, তাড়াহুড়ো করে আনা এই সংশোধনী বিল পাস বলে একটি ত্রুটিপূর্ণ আইন জন্ম নেবে। প্রসঙ্গত, রাজনীতির ময়দানে টানাপড়েনের এই আবহেই টানা দু’দিনের বিতর্কের পরে বুধবার বিকেলে ধ্বনিভোটে প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী সংশোধনী বিল পাস হয় লোকসভায়। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বিতর্কে অংশ নিলেও ভোটাভুটির আগে ওয়াকআউট করেন কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলির সাংসদেরা। ধর্মেন্দ্রের ইস্তফা, প্রশ্নফাঁসের মামলার বিচারে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টানোর জন্য নন্দন নীলেকণির নেতৃত্বে ছ’জন সদস্যের ‘টাস্ক ফোর্স’ (বিশেষজ্ঞ কমিটি) গড়ার পাশাপাশি নতুন সংশোধনী বিলকেও ‘ককরোচ’-আন্দোলনের জয় বলে মনে করছেন অনেকেই। কিন্তু বিল পাসের পরেই দীপকে বলেন, ‘‘মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শুধুমাত্র আইন সংস্কার করে সমস্যার সমাধান হবে না। দেশে অনেক আইন সংস্কার হয়েছে, কিন্তু মানুষের উদ্দেশ্য বা মানসিকতার উন্নতি না হলে কিছুই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।’’ প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গঠিত ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের প্রসঙ্গ টেনে দীপকে বলেন, ‘‘সিবিআই-এর আইনজীবী অনুপস্থিত থাকায় প্রথম শুনানিই তো স্থগিত করতে হয়েছে!’’ সেই সঙ্গেই তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘সব আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা না হলে আবার আন্দোলনে নামব।’’
‘আসরে’ সিআরপিএফ, দিল্লি সরকার
দিল্লিতে পড়ুয়াদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দমনপীড়ন চালানোর অভিযোগ উঠেছে দিল্লি পুলিশ, সিআরপিএফ এবং তারই অধীনস্থ র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ)-এর বিরুদ্ধে। এই আবহে বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধির চেষ্টা করলেন সিআরপিএফ-এর ডিজি জ্ঞানেন্দ্রপ্রতাপ সিংহ। সিআরপিএফে থাকা প্রত্যেকের সদুদ্দেশ্যে করা প্রতিটি কাজের দায়ভার নিজের কাঁধে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। বাহিনীর সকলকে নির্ভীক ভাবে দায়িত্ব পালন করার বার্তাও দিয়েছেন। সিআরপিএফের একটি অনুষ্ঠানে জ্ঞানেন্দ্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “কর্তব্য পালনের সময় সদুদ্দেশ্যে আপনারা যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার সব দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। নির্ভীক ভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যান। দায়িত্ব পালনের সময় কোনও দ্বিধা রাখবেন না।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, “যদি কোনও কিছুর দায় বা দায়িত্ব নিতে হয়, সিআরপিএফের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) হিসাবে তা আমি নেব।”
অন্য দিকে, দিল্লির বিজেপি পরিচালিত সরকার বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সিজেপি-র নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে ধর্না-বিক্ষোভ বা ২০ জুলাই সংসদ ভবন অভিযানে যোগ দেওয়া আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ নতুন করে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেবে না। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘জাতীয় রাজধানী অঞ্চল’ দিল্লির স্বরাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, এই মামলাগুলিতে যদি ইতিমধ্যে গ্রেফতার বা আটক করা হয়ে থাকে, তবে গ্রেফতারের পর্যালোচনা এবং ধৃত ব্যক্তিদের মুক্তির প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। লেখা হয়েছে, ‘‘দিল্লি জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (এনসিটি) সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আর কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব নেই এবং ভবিষ্যতে এ-সংক্রান্ত কোনও পরবর্তী নির্দেশ ছাড়াই বকেয়া বিষয়গুলির নিষ্পত্তি হবে।’’
তবে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আদেশ অনুযায়ী, এই সুরক্ষা ‘অপরাধমূলক পূর্ব ইতিহাস’ (ক্রিমিনাল অ্যান্টিসিডেন্টস) রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। গত ২০ জুলাই সিজেপি-র সংসদ অভিযান চলাকালীন সংঘটিত হিংসার ঘটনায় দিল্লি পুলিশ ১৩টি এফআইআর নথিভুক্ত করেছে। পুলিশের দাবি, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে এমন অনেককে চিহ্নিত করা গিয়েছে, যাঁদের নাম আগে থেকেই পুলিশের খাতায় রয়েছে। শতাধিক ফুটেজকে ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম’ (মুখের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে ব্যক্তিকে শনাক্ত করার প্রযুক্তি)-এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে এমন ২,৮৭৩ জনকে চিহ্নিত করেছেন তদন্তকারীরা। সিজেপি নেতৃত্ব এবং বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশকে হাতিয়ার করে দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে পারে। প্রসঙ্গত, বিজেপি পরিচালিত দিল্লি সরকারের নিজস্ব স্বরাষ্ট্র দফতর (হোম ডিপার্টমেন্ট) রয়েছে। তবে এই দফতরের অধীনে সরাসরি পুলিশ প্রশাসন পরিচালিত হয় না। দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্ত্রকের অধীনে। জেল পরিচালনা, ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা আটকের ক্ষমতা এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কিছু নীতিনির্ধারক প্রশাসনিক কাজ এই দফতরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
পেলেট নিয়ে সুপ্রিম-বার্তা
শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী কোনও পরিস্থিতিতেই ছর্রা গুলি ব্যবহার করতে পারে পুলিশ। বৃহস্পতিবার তা স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে কেন্দ্রকেও নির্দেশ দিল, যন্তর মন্তরে আন্দোলনের সময়ে মোতায়েন থাকা র্যাফের কাছে কী কী কার্তুজ ছিল, সেই হিসেব সংরক্ষণ করতে হবে।
নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনের সময়ে ছর্রা গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। তাতে বেশ কয়েক জন জখমও হন বলে অভিযোগ। এই অবস্থায় ছর্রা গুলির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আর্জিতে মামলা হয় সুপ্রিম কোর্টে। মামলাকারীদের মধ্যে দু’জনের দাবি, তাঁরা আন্দোলনের সময়ে ছর্রা গুলিতে জখম হয়েছেন। ছর্রার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আর্জিতে মামলা করেন কেন্দ্রের প্রাক্তন তথ্য কমিশনার তথা অবসরপ্রাপ্ত আমলা যশবর্ধন আজাদও।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। তাতে শীর্ষ আদালত জানায়, বাহিনীর নিয়মবিধি অনুযায়ী ছর্রা গুলি ব্যবহার করতে পারে পুলিশ। তবে তা শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই। এ প্রসঙ্গে ‘ব্যুরো অফ পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর নির্দেশিকার কথাও উল্লেখ করে আদালত। ছর্রা গুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আদর্শ কার্যপদ্ধতি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর) কী রয়েছে, তা-ও দিল্লি পুলিশকে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের সময়ে ছর্রা গুলি চালানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এ দিন শুনানির সময়ে কেন্দ্রের হয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, আন্দোলনের সময়ে যন্তর মন্তরে মোতায়েন থাকা র্যাফের কার্তুজের হিসেব সংরক্ষণ করতে হবে। আন্দোলনের সময়ে যাঁরা ছর্রা গুলিতে জখম হয়েছেন, তাঁদের সঠিক চিকিৎসারও নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে তৃতীয় দফার বৈঠক করার পর সিজেপি জানায়, তাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার পরেই আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তাদের আবেদন, এত দিন যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চলছিল, তা তুলে নিন।
- ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের চাপে ইস্তফা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিটের প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে প্রথম থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিল সিজেপি।
- ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাকে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছেন সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এই ‘জয়ের’ কৃতিত্ব পুরোটাই দেশের পড়ুয়া এবং যুব সমাজকে দিচ্ছে সিজেপি। কয়েক দিনের এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ দীপকে। শত ‘চাপে’ অনড় ছিলেন দাবিতে। সেই দাবি পূরণ হতেই বাঁধভাঙা আনন্দে ফেটে পড়েন তিনি।
-
ককরোচ সমর্থককে মারধরে অভিযুক্ত স্বতন্ত্রকে অবশেষে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশ, পাঠানো হল জেল হেফাজতে
-
‘হাতজোড় করে আন্দোলনে ইতি টানতে চেয়েছিলেন’, যন্তর মন্তরে ‘ককরোচদের’ ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ওয়াংচুকের
-
ককরোচদের সংসদ অভিযানের দিন ছর্রা গুলিতে জখম হন অন্তত ১০ জন! আরটিআই-এর জবাবে বলল দুই হাসপাতাল
-
‘অনশন ভাঙার ছবি প্রকাশ করে প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন মন্ত্রীরা!’ নড্ডার হাতে স্যুপ খাওয়ার ১৪ দিন পরে সরব হলেন ওয়াংচুক
-
ধৃত আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি! বাঁকিপুরে বিজেপির বিপর্যয়ের পরেই পটনায় ফের শুরু ককরোচ বিক্ষোভ