Advertisement
E-Paper

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট! বুধে বৈঠকে বসছে ইস্তফার দাবিতে অনড় ‘ইন্ডিয়া’, মমতাকে পাল্টা খোঁচা শুভেন্দুর

নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি এবং তাতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলা দ্রুত শুনতে মঙ্গলবার সম্মত হল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৫৮
DMK and AAP not to participate in INDIA Alliance meet, SC agrees to early hearing of plea against Election Commission panel functioning

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মূল উদ্দেশ্য, জাতীয় স্তরে শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে যৌথ রণকৌশল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের আবহে বিরোধী ঐক্য ঝালিয়ে নিতে বুধবার দুপুরে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকে বসছে ‘ইন্ডিয়া’। তবে বিজেপি বিরোধী জোটের এই উদ্যোগ যে পুরোপুরি সফল হয়নি, আম আদমি পার্টি (আপ), ডিএমকের মতো দলের অনুপস্থিতির বার্তায় ইতিমধ্যেই তা স্পষ্ট হয়েছে।

দিল্লির বৈঠকের আগেই অবশ্য মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতের সিদ্ধান্তে কিছুটা বাড়তি অক্সিজেন পেয়েছে বিরোধী শিবির। নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি এবং তাতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলা দ্রুত শুনতে সম্মত হল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। আগামী সপ্তাহে মামলাটির শুনানি হবে। অন্য দিকে, দিল্লি বৈঠকের আগে মঙ্গলবার তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, দিল্লিতে মমতা দিমাগি নকশালদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন!

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে ঘিরে তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই কমিশনার, সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর অভিযোগ, তাঁদের অন্ধকারে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষা, বেআইনি ভাবে ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদল, এসআইআর-এর পর ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং যুক্ত করা সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সঁধু এবং জোশী। গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা। বিতর্কের মুখে কমিশনের ব্যাখ্যা, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশন এই ব্যাখ্যা দিলেও বিতর্ক থামেনি। উল্টে বিরোধী দলগুলি কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে জ্ঞানেশের পদত্যাগ দাবি করেছে। ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকের আগে মঙ্গলবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেও সুর চড়ানো হয়েছে কেন্দ্র এবং জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে। এমনকি, চাওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইস্তফাও!

জ্ঞানেশ-মামলার দ্রুত শুনানি

নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি এবং তাতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ সংক্রান্ত জনস্বার্থ মামলায় আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী বিকাশ সিংহ বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে দ্রুত শুনানির বিষয়টি উত্থাপিত করেছিলেন। আদালতে তিনি জানান, এক জন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনে সর্বসম্মতিক্রমে বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এই সূত্রেই তিনি বলেন, “যে ভাবে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে, তাতে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।”

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে বাকি দুই কমিশনারকে না-জানিয়ে একক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগে দায়ের জনস্বার্থ মামলায় সমস্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলি খারিজ করার আর্জি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে শুক্রবার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আইনজীবী শৈলেন্দ্র মনি ত্রিপাঠী। কমিশনের অন্দরে জ্ঞানেশের সিদ্ধান্তগুলিকে খারিজ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ‘সাধারণ অভিযুক্তের মতো’ আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে আবেদনকারী পক্ষ। সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। তিন সদস্যের কমিশনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন।

প্রায় তিন দশক আগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ‘সমমর্যাদার মধ্যে প্রথম’ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। বর্তমান আইনি কাঠামোয় ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত এবং কার্যকালের মেয়াদ) আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কাজকর্ম যতটা সম্ভব সর্বসম্মতিক্রমে পরিচালিত হবে। কোনও বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি, দুই নির্বাচন কমিশনারের অজ্ঞাতসারে একক ভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জ্ঞানেশ।

‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে নেই কারা?

তামিলনাড়ুতে বিধানসভা ভোটের পরে সহযোগী কংগ্রেস সি জোসেফ বিজয়ের টিভিকের সঙ্গে হাত মেলানোর পরেই ‘ইন্ডিয়া’ ছাড়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিন। তাঁকে বা তাঁর দলের কোনও প্রতিনিধিকে বুধবার কনস্টিটিউশন ক্লাবের বৈঠকে দেখা যাবে না। একই ভাবে গরহাজির থাকবেন দিল্লি বিধানসভা ভোটের সময় বিরোধী জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা অরবিন্দ কেজরীবালের ‘আপ’। ফেব্রুয়ারিতে পঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন। সে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ছে শাসকদল আপ। ফলে এ ক্ষেত্রেও অনুপস্থিতি প্রত্যাশিতই ছিল। তবে আপ এবং ডিএমকের তরফে সংসদের দু’কক্ষে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রস্তাবে সই করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেসের সহযোগী দল জেএমএমের প্রধান হেমন্ত সোরেনও বুধবারের বৈঠকে থাকছেন না বলে সূত্রের খবর, তবে বিরোধী জোটের বৈঠককে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় জল্পনার বিষয় হতে পারে উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবের অনুপস্থিতি। উত্তরপ্রদেশের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আসন রফাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস এবং এসপি-র মন কষাকষি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। অখিলেশ তাঁর পিডিএ (পিছড়ে বর্গ, দলিত, অল্প সংখ্যক বা সংখ্যালঘু) রথযাত্রা শুরুর জন্য রাহুল গাঁধীর কেন্দ্র রায়বরেলীকে বেছে নেওয়ায় প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতারা। এই পরিস্থিতিতে বুধবার অখিলেশ তাঁর দলে অপেক্ষকৃত কম ওজনদার কোনও নেতাকে পাঠিয়ে কংগ্রেসকে চাপে ফেলতে পারেন বলে জল্পনা রয়েছে। ডিএমকে মুখপাত্র টিকেএস এলাঙ্গোভান মঙ্গলবার অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেসের স্বার্থপর আচরণের কারণেই অখিলেশ ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠক এড়িয়ে যাচ্ছেন।

শুভেন্দুর নিশানায় মমতা ও ‘দিমাগি নকশাল’

দিল্লিতে ‘দিমাগি নকশাল’-দের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে এমনটাই বলেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, বিরোধীদের জোট ‘ইন্ডিয়া’-র কোনও অস্তিত্বই নেই। মঙ্গলবার সল্টলেকে বিজেপির দফতরে জনতার দরবার সেরে বেরোনোর সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ইন্ডি জোটের পিন্ডি অনেক আগে চটকে গিয়েছে। কী করতে যাচ্ছেন (মমতা)? দিমাগি নকশালদের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন।’’

সেখানেই থামেননি শুভেন্দু। মমতার নাম না নিয়েই কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘আজ়াদি স্লোগান যিনি দেন, তিনি কী করতে পারেন সকলে জানেন। দিল্লি পুলিশ, আইবি-কে বলব ভাল করে নজর রাখবেন। ওঁর সঙ্গে দেশবিরোধী শক্তির বৈঠক না হয়!’’ শুভেন্দুর কথায়, ‘‘দিমাগি নকশালদের এখন মূল মন্ত্রণাদাতা হয়েছেন (মমতা)। এক হাতে জামাত, এক হাতে দিমাগি নকশাল। দু’জনকে নিয়ে চলছেন।’’

অন্য দিকে, মমতা মঙ্গলবার দিল্লি পৌঁছে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘‘যা কিছু বলার দরকার, আমি আগামিকালের বৈঠকে বলব। আপনারা জানেন, আমাদের লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন। এই পুরো সফট্‌ওয়্যার টিমের বিরুদ্ধে এই বৈঠক, যারা মানুষকে ঠকিয়েছে এবং মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’’ জ্ঞানেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মমতার প্রতিক্রিয়া, ‘‘ভ্যানিশজি, ভ্যানিশজি। আপনারা জানেন, গোড়া থেকেই আমি তাঁকে ভ্যানিশ বলে ডাকছি।’’

কংগ্রেসের দাবি, বামেদের মিছিল

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের জেরে দেশজোড়া বিতর্কের আবহে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে। জ্ঞানেশকে ‘মোদী সরকারের হাতের পুতুল’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। অভিযোগ, জ্ঞানেশের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই কারণে নৈতিকতার খাতিরে তাঁরও পদত্যাগ করা উচিত বলেও মতপ্রকাশ করেন খড়্গে। অন্য দিকে জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে মঙ্গলবার দিল্লিতে নির্বাচন সদনের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছে বাম দলগুলি। কলকাতায় বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আইএসএফ প্রতিনিধিদল মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে গিয়ে জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে স্মারকলিপি দেন।

কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ছিল মঙ্গলবার। এই বৈঠকে ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে পাঁচটি দাবি জানান খড়্গে—

১. ভোটার তালিকায় কোথায় কী বদল করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনা হোক।

২. এসআইআরে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের পুনরায় নাম তোলার সুযোগ দেওয়া হোক। কী কারণে নাম বাদ পড়েছে, তা-ও সবিস্তারে জানানো হোক।

৩. ভোটার তালিকা এবং এই সংক্রান্ত তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলির হাতে তুলে দেওয়া হোক।

৪. এসআইআর-পর্বে যেখানে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক।

৫. নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য এবং সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ভাবে জানানো হোক, যাতে কোনও রাজনৈতিক দল বা ভোটারের মনে না-হয় যে, তারা সব তথ্য পাচ্ছে না।

জ্ঞানেশকে কটাক্ষ করে খড়্গে বলেন, “দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মোদী সরকারের হাতের পুতুল হয়ে উঠেছেন। তাঁর সহকর্মীরাই তাঁকে বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না।” রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা জ্ঞানেশের অভিযোগ, বিজেপি এবং মোদী সরকারের হয়ে ভোটারদের নাম কাটার ষড়যন্ত্রে শামিল নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকেরা। মোদী সরকার নতুন ভোটারদের নাম তোলার প্রক্রিয়াও কঠিন করে দিয়েছে বলে দাবি করেন খড়্গে।

সীমা খন্নাকে সিইওর চিঠি

জ্ঞানেশ-বিতর্কের আবহে এ বার নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের ক্ষমতাবৃদ্ধি চেয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেন মহারাষ্ট্রের সিইও। ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) এস চোকলিঙ্গম গত ২৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের এই মর্মে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ সফ্‌টওয়্যারেও চারটি বদলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মহারাষ্ট্রে এসআইআর-এর কাজ চলছে। গত ৩১ অগস্ট সে রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। বাদ পড়েছে ২১.১ শতাংশ ভোটারের নাম। আগামী ১৬ নভেম্বরে মহারাষ্ট্রের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন।

ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ, সচিব পর্যায়ের দুই আধিকারিকের পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের সিইও চিঠি দিয়েছেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নাকেও। এই সীমার বিরুদ্ধেই ভোটার তালিকা তৈরির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েমের অভিযোগ তুলেছেন দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়।এসআইআর-পর্বে আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে বয়স বা বাবা-মায়ের নামের ‘ম্যাপিং’ না-হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম তথ্যগত অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র জন্য বাদ যাচ্ছে। নির্দিষ্ট নথি নিয়ে নাম তোলার আর্জি জানাতে হচ্ছে সেই ভোটারদের। মহারাষ্ট্রের সিইও-র চিঠিতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ইআরও-দের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য কোনও ভোটারকে তলব করতে পারেন ইআরও। নথিপত্র যাচাইয়ের পর ইআরও কী করবেন, তা ইসিআইনেট সফ্‌টওয়্যারে বলা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দু’টি বিকল্পের মধ্যে যে কোনও একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে ইআরও-দের। কিন্তু যে ভোটারেরা যথাযথ নথি পেশ করেছেন, কিংবা বয়স, অসুস্থতা বা অন্য কোনও কারণে যাঁদের পক্ষে শুনানিতে হাজির হওয়া সমস্যার, তাঁদের ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি ইআরও-কে। তাই মহারাষ্ট্রের সিইও ওই সফ্‌টওয়্যারে একটি তৃতীয় বিকল্প যুক্ত করার আর্জি জানিয়েছেন, যেখানে লেখা থাকবে, ‘শুনানি থেকে ছাড় দেওয়া হল’।

কোন ১৩টি নথি দেখিয়ে ভোটাররা আর্জি জানাতে পারবেন, তা আগেই জানিয়ে দিয়েছে কমিশন। মহারাষ্ট্রের সিইও কমিশনকে দেওয়া চিঠিতে এগুলির সঙ্গে ‘অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি’কেও যুক্ত করার আর্জি জানিয়েছেন। কারণ তাঁর মতে, গৃহহীন, ভবঘুরে কিংবা যৌনকর্মীরা কমিশন উল্লিখিত বা শুনানির নোটিসে বলে দেওয়া ১৩টি নথি দাখিল করতে ব্যর্থ হতে পারেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কেবল বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও)-দের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’র নিষ্পত্তি করতে পারেন না ইআরও। সে ক্ষেত্রে ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’র জন্য নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের নথি যাচাইয়ের জন্য জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা ডিইও-কে পাঠানো হয়। চিঠিতে মহারাষ্ট্রের সিইও-র আর্জি, নাম বাদ পড়া ভোটারের নথি সন্তোষজনক হলে ইআরও-কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হোক। সে ক্ষেত্রে নথি যাচাইয়ের পর ভোটার তালিকায় কোনও ভোটারের নাম যুক্ত বা বাদ দিতে পারবেন ইআরও।

প্রতিবেদন অনুসারে, মহারাষ্ট্রের সিইও-র দেওয়া চিঠির প্রতিপাদ্য হল, ভোটারদের নাম যুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইআরও-দের ক্ষমতা দেওয়া হোক। কিন্তু ‘ইসিআইনেট’ সফ্‌টওয়্যারে ইআরও-দের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। প্রসঙ্গত, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী, একটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটার তালিকা তৈরির দায়িত্ব রয়েছে ইআরও-দের হাতে। ঘটনাচক্রে, মহারাষ্ট্রের সিইও যে দিন কমিশনের কর্তাদের চিঠি দিয়েছেন, তার ঠিক আগের দিন (২৩ সেপ্টেম্বর) ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তদন্তমূলক একটি প্রতিবেদনকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন পড়ে যায়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশীর অভিযোগ যে, তাঁদের অন্ধকারে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কমিশনে।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দুই নির্বাচন কমিশনারও কমিশনের সফ্‌টওয়্যার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ইআরও-দের ক্ষমতাবৃদ্ধির কথাও বলেছিলেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই কমিশনারের অভিযোগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির বিষয়টি এখন আর বিকেন্দ্রীভূত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। গোটা বিষয়টি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা। এমনিতে প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের কাজের দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের কাছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফ্‌টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ‘ইসিআইনেট’-এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরও-দের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সঁধু জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সঁধু বলেন, “আইন অনুযায়ী তিনি এটি (পোর্টাল) নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।”

প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে এই কেন্দ্রীকরণের ফলেই গোয়ায় বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। গত ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, তথ্যগত অসঙ্গতি, মানে পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম বা বয়সের অমিল থাকা ভোটারদের নথি জমা দেওয়ার ও শোনার সুযোগ দিতে হবে। গোয়ার ইআরও-রা তা শুনে ৯৭ জনকে যোগ্য বলে রায় দেন। কিন্তু সফ্‌টওয়্যারে সেই রায় লেখার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-র দফতর সে রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতীকে চার বার চিঠি লিখে, সীমা খন্নাকে সেই চিঠির কপি দিয়ে, রোলব্যাক অপশন চালু করতে বলে। যাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশমতো বাদ দেওয়া নাম ফেরানো যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও উত্তর আসেনি, নথি জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়নি। ৯৭ জন যোগ্য ব্যক্তি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।

Gyanesh Kumar Election Commission of India Supreme Court Election Commission CEC INDIA Alliance Anti BJP Alliance

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy