অস্ট্রেলীয় মিশনারি গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে খুনের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী, রবীন্দ্র পাল ওরফে দারা সিংহের মুক্তির আবেদনে সায় দিল না ওড়িশার বিজেপি সরকার! তাদের আশঙ্কা, ২৪ বছর ধরে জেলবন্দি দারা মুক্তি পেলে সে রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে সামাজিক অস্থিরতা।
গত ২৬ বছর ধরে জেলবন্দি ৬৭ বছরের দারা সুপ্রিম কোর্টের কাছে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিলেন ২০২৪ সালের অগস্টে। ঘটনাচক্রে, ওড়িশায় বিজেপি ক্ষমতা দখলের পরেই! এর পরে শীর্ষ আদালত দারার আবেদনের বিষয়ে ওড়িশা সরকারের মতামত জানতে চেয়েছিল। সে সময়ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ওড়িশা সরকার। সম্প্রতি নতুন করে শীর্ষ আদালতে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিলেন দারা। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর তার শুনানি হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নের জবাবে ওড়িশা সরকারের ‘সাজাপ্রাপ্ত বন্দি বিষয়ক পর্যালোচনা বোর্ড’ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দারাকে মুক্তি দেওয়া উচিত নয়। সম্প্রতি কেন্দুঝর জেলা কারাগারের বাইরে দারা অনুগামীদের সংগঠন ‘দারা সেনা’র কর্মীদের প্ররোচনামূলক স্লোগান দেওয়ার একটি রিপোর্টকে মূল ভিত্তি করে গত ৩১ অগস্টের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে বোর্ডের তরফে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালের ২২ জানুয়ারি কেন্দুঝরের মোহনপুরে অস্ট্রেলীয় মিশনারি গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই শিশুপুত্রকে ( (ফিলিপ ও টিমোথি) পুড়িয়ে মারার ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল বজরং দলের। কট্টর হিন্দুত্ববাদী দারা ওই সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ। সেই সময়ে বজরং দলের রাজ্য সভাপতি ছিলেন প্রতাপ ষড়ঙ্গী। ঘটনাচক্রে, যিনি নরেন্দ্র মোদী মন্ত্রিসভার প্রাক্তন সদস্য তথা বালেশ্বরের বর্তমান বিজেপি সাংসদ। মূল অভিযুক্ত দারা সিংহের যাবজ্জীবন জেল হলেও তদন্তে রেহাই পেয়ে যায় বজরং দল। প্রতাপ এই ঘটনার সঙ্গে যাবতীয় যোগ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁকে পাল্টা জেরাও করেননি সরকারি আইনজীবী। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দারার পক্ষে শীর্ষ আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন, যিনি জ্ঞানবাপী এবং মথুরা শাহি ইদগাহ মামলায় হিন্দু পক্ষের আইনজীবী।
স্টেইনস হত্যাকাণ্ডের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার ঘটনাটিকে ‘দুষ্কৃতী কার্যকলাপ’ বলে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তথ্যে উঠে আসে স্টেইনসের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের ধর্মান্তরণের অভিযোগ তুলে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার চালাচ্ছিল বজরং দল-সহ কয়েকটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। তারই পরিণতিতে হয়েছিল ওই হত্যাকাণ্ড। ঘটনাচক্রে, ২০০৭-২০০৮ সালে ওড়িশারই কন্ধমাল জেলায় গোষ্ঠীহিংসায় শতাধিক খ্রিস্টান নিহত হন। বহু গির্জা ও বাড়ি পোড়ানো হয়। সে বারও অভিযোগের তির উঠেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, বনবাসী কল্যাণ পরিষদের মতো সংঘ-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের দিকে।