দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ রামলীলা ময়দানে দশেরা উদ্যাপন অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার ‘অত্যাচার এবং সন্ত্রাসের অবসান’ ঘটানোর বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রতীকী রাবণবধ উৎসবকে ‘মিথ্যার উপর চিরন্তন সত্যের বিজয়ের প্রতীক’ বলে চিহ্নিত করে তিনি বললেন, ‘‘দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত ভাবে লড়াই করতে হবে। ভারত ভাঙার চক্রান্ত ব্যর্থ করতে হবে।’’
মঙ্গলবার রামলীলা ময়দানে মোদীর মুখ থেকে শোনা গিয়েছে সামাজিক বিভাজনের তত্ত্বও! তাঁর কথায়, ‘‘যে শক্তি দেশের ক্ষতি করে, যারা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং যে মানসিকতা আমাদের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করে, তারাই হল দেশের শত্রু। ভারতমাতার শত্রুদের চিনতে হবে। তাদের পরাস্ত করতে হবে।’’ সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘প্রভু রামের আদর্শ এবং রামলীলার ঐতিহ্য আজও সমগ্র দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছে। ভারতের প্রতিটি গ্রাম ও শহরে এই উৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে।’’
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা আক্রমণ ও লুটপাটের পর ভারত এখন নিজের পরিচিতি ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান যে, গত ১২ বছরে ৬০০টিরও বেশি প্রাচীন মূর্তি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘রামরাজ্য মানে হল বৈষম্যহীনতা, সকলের জন্য ন্যায়বিচার এবং জনগণের কল্যাণে ক্ষমতা ব্যবহার করা।’’ অন্য দিকে, দিল্লিতে মোদীর বক্তৃতার আগেই মহারাষ্ট্রের নাগপুরে মঙ্গলবার আরএসএস-এর বিজয়া দশমী উদ্যাপন বক্তৃতায় সরসংঘচালক মোহন ভাগবত দাবি করেন ‘অশুভ শক্তি’ ভারতে সরকার ফেলার চেষ্টা করছে! সেই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ভারতের অগ্রগতি আটকাতে না পেরে অশুভ শক্তি দেশকে ভাঙার চেষ্টা করছে। এই সব অশুভ শক্তি জানে, গত কয়েক দশক ধরে ভারত যে ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে তারা এই অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারবে না। তাই তারা ভারত এবং সংঘকে ভাঙার চেষ্টা করছে।”
ভারতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার অভিযোগ তুলে ভিন্দেশের উদাহরণও টেনেছেন ভাগবত। তাঁর দাবি, ভারতের পরাজয় চায় বিশ্বের অনেক শক্তি। তবে নির্দিষ্ট করে কারও নাম করেননি তিনি। সম্প্রতি ফ্রান্স, নেপাল এবং বাংলাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে যে জনবিক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল, তার উদাহরণ টেনে আরএসএস প্রধান বলেন, “পশ্চিম থেকে ঝড় আসছে, যা সংস্কৃতি, প্রচলিত ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাকে ঘৃণা করে। এই ঝড় ধ্বংস চায়।” নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতেই কেউ কেউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের ‘অরাজকতা’ তৈরি করছেন বলে দাবি ভাগবতের। ভাগবতের সংযোজন, দানবীয় শক্তি ভারত, হিন্দু এবং সংঘকে ধ্বংস করতে পরিকল্পনা করছে। সেই অনুযায়ী কাজ করছে। ক্ষমতা দখলের ইচ্ছায় এবং জ্ঞানের অভাবে কয়েক জন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলেও দাবি করেন সংঘপ্রধান। তবে গণতন্ত্রে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেছেন ভাগবত। তিনি বলেন, “সমস্যা হলে নিশ্চয়ই আন্দোলন হবে। গণতন্ত্রে আন্দোলন হবেই। কিন্তু সেগুলির মাধ্যমে সমাধানসূত্র খোঁজা উচিত। আন্দোলনের লক্ষ্যই হল সমাধান খুঁজে বার করা।”
এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এবং দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরেই দিল্লি-সহ দেশের নানা প্রান্তে আন্দোলন চলছে। এক দিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র দলগুলি, অন্য দিকে, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে কমিশন এবং শাসকদল বিজেপিকে নিশানা করছে। এই আবহে একই সুরে মোদী এবং ভাগবতের মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ জ্ঞানেশ-বিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জমানা পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কথা বলেছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, “সরকার অভিযোগ করছে যে, বিরোধীরা জমানা পরিবর্তন করতে চায়। আমরা আসলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা চাই। কিন্তু এই রকম দমনপীড়ন চলতে থাকলে জমানা পরিবর্তনই হবে।”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রশান্তের এই মন্তব্যের সমালোচনায় সরব হয়েছিল বিজেপি। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের পথে হেঁটে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছে বিরোধীরা। রাজনাথ বলেন, “এটা এসআইআর কিংবা নির্বাচনী সংস্কারের জন্য লড়াই নয়। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও নয়। এটা ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র।” রাজনাথকে পাল্টা বিঁধতে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের একটি উক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কংগ্রেস। দলের নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, “প্রণববাবু বলতেন, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের বিরোধিতা করা, ভুলত্রুটি তুলে ধরা এবং তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো।” বিজেপির দলীয় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সংঘের বিশেষ ভূমিকা থাকে বলে মনে করেন অনেকেই। দেশ জুড়ে জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভের আবহে ভাগবত যে ভাবে ‘জমানা পরিবর্তনের চেষ্টার’ বিরুদ্ধে বার্তা দিলেন, তাকে ইঙ্গিতবাহী বলেই মনে করছেন অনেকে।