দিনের শেষে বাড়ি ফিরে সকলেই চান শান্ত পরিবেশ, আরাম, স্বস্তি। সেই ইচ্ছাতেই বাধ সাধতে পারে, অগোছালো ঘরদোর। বাড়িতে পা দেওয়ার পরেই যদি চোখ যায় এলোমেলো হয়ে থাকা টেবিল কিংবা বসার ঘরে সোফায় তালগোল পাকিয়ে রাখা কুশনে, কারই বা দেখতে ভাল লাগে?
শৌখিনতার চেয়েও জরুরি হল পরিচ্ছন্নতা, পারিপাট্য। আসবাব-ঘর যত সাধারণই হোক, তা যদি গোছানো থাকে, চোখ-মন দুইয়েরই আরাম হয়। কিন্তু নিয়ম করে ঘরদোর পরিষ্কার করা কি এতই সহজ! অফিস-বাড়ি, রান্না সামলাতেই যেখানে নাভিশ্বাস ওঠে সেখানে, কী ভাবে গৃহ হবে শান্তির নীড়!
এই কাজেই সাহায্য করতে পারে জাপানি রীতি। ভারতীয়দের প্রচলিত পন্থা বা রীতির চেয়ে তা যে পুরোপুরি আলাদা, তেমন বলা চলে না। তবে, জাপানিদের কাছে ঘরদোর পরিষ্কার করা শুধু কাজ নয় বরং মনের শান্তি খোঁজার এক আত্মিক চর্চা।
‘ওসোজি’ বা বাৎসরিক শুদ্ধি অভিযান
‘ওসোজি’ শব্দের সহজ অর্থ গভীর ভাবে পরিষ্কার করা। নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আগে জাপানে এই ঐতিহ্যবাহী আচারটি পালন করা হয়। সাধারণ ভাবে ঘর ঝাড়পোঁছ করা নয়, বরং প্রতিটি ঘর আলাদা করে পরিষ্কার করা, প্রয়োজনহীন জিনিসপত্র বাদ দেওয়া এবং বাড়িটিকে নতুন করে সাজানোই এর মূলমন্ত্র। ঘরদোর নতুন রং, পর্দায় সাজলে মনও ভাল লাগে।
কনমারি পদ্ধতি: আনন্দের ছোঁয়া খুঁজে নেওয়া
গৃহসজ্জা ব্যবস্থাপক মারি কোন্দোর হাত ধরে প্রচলিত এই পদ্ধতির মূল কথাই হল নির্দিষ্ট জিনিসপত্র ধরে ঘর গোছনো। যেমন— এক বার শুধু সব জামাকাপড়, অন্য বার সব বই বা কাগজপত্র এক জায়গায় জড়ো করা। অনেক সময় পুরনো বই, চিঠি বা বিশেষ কারও দেওয়া পোশাক বা শাড়ি হাতে আসে। সেগুলি সঙ্গে জুড়ে থাকা সুখস্মৃতি মন ভাল করে দেয়। এই পন্থা বলে, যা আনন্দ দেয়, রাখা থাক শুধু সেইগুলি। জীবন থেকে কোনও ভাবনা, স্মৃতি বাদ দিতে চাইলে সেগুলি সরিয়ে ফেলতে পারেন।
দানশারি: মায়া ত্যাগ করা জরুরি
হিদেকো ইয়ামাশিতার ভাবনায় তৈরি এই দর্শনের মূল কথা হল— অপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রতি মায়া ত্যাগ করা। তিনটি ধাপে কাজটি করে।
দান: অপ্রয়োজনীয় নতুন জিনিস ঘরে না আনা।
শা: জমানো বাড়তি জিনিসপত্র বাদ দেওয়া।
রি: জিনিসপত্রের প্রতি লোভ বা আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
সহজ কথায়, অতিরিক্ত জিনিস জমিয়ে রেখে ঘর জবরজং করে ফেলার অভ্যাসটি দূর করাই এর মূলমন্ত্র। ঘর যত ফাঁকা থাকবে, জিনিসপত্র কম থাকবে, ততই ঘরদোর পরিষ্কার করা সহজ হবে।
ফাইভ-এস পদ্ধতি: কাজের সুবিধার্থে সুশৃঙ্খল পরিবেশ
এই ফাইভ-এস নিয়মটি ঘর বা অফিস, সব জায়গাতেই সমান কার্যকরী। জাপানি পাঁচটি শব্দের উপর ভিত্তি করে তৈরি এই ধারাগুলি হল—
সেইরি (বাছাই): প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রকে আলাদা করা।
সেইতন (বিন্যাস): প্রতিটি জিনিসের নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করা।
সেইসো (পরিচ্ছন্নতা): নিয়মিত পরিষ্কার রাখা।
সেইকেৎসু (মান নির্ধারণ): গোছানোর একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বজায় রাখা।
শিৎসুকে (অভ্যাস গঠন): এই শৃঙ্খলা ধরে রাখা ও চর্চা করে যাওয়া।
এই ধাপগুলি মেনে চললে দৈনন্দিনের অনাবশ্যক ঝামেলা কমে এবং কাজের গতি বেড়ে যায়।
ওচানোমা সুকিমা: ফাঁকা জায়গার সৌন্দর্য উপভোগ
এই দর্শন বলে, আসবাবপত্র বা কক্ষগুলির মাঝে সচেতন ভাবে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রাখা জরুরি। ঠাসাঠাসি না করে কিছু ঘর ফাঁকা রাখলে আলো-হাওয়া বেশি খেলে। চলাফেরা করতেও সুবিধা হয়। ঘর দেখতেও ভাল লাগে।