ভারতীয় পরিবারে বিয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গে সমীকরণের পাশাপাশি বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কও অনেক সময়ে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে যায়। বিশেষ করে একই বাড়িতে থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সংসারের নিয়ম, ব্যক্তিগত পছন্দ— সব কিছুতেই পরিবারের অন্য সদস্যদের উপস্থিতি থাকে। এখানেই তৈরি হতে পারে টানাপড়েন। প্রশ্ন ওঠে, স্বামী কার পক্ষ নিচ্ছেন, বাবা-মা, না কি স্ত্রী?
সম্প্রতি সম্পর্ক বিষয়ক পরামর্শদাতা চেতনা চক্রবর্তী সমাজমাধ্যমে সেই টানাপড়েনের প্রসঙ্গ তুললেন। তাঁর বক্তব্য, নিজের বাবা-মাকে সম্মান করা এবং তাঁদের পাশে থাকা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু স্ত্রীকে কখনও এমন বলা উচিত নয় যে, ‘‘আমার মা-বাবাই আমার এক নম্বর অগ্রাধিকার, তাঁদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া তোমার আর কোনও উপায় নেই।’’ চেতনার কথায়, ‘‘পরিণতমনস্ক, সুচরিত্র-মূল্যবোধসম্পন্ন পুরুষ এমন কথা কোনও দিনও বলবেন না তাঁর স্ত্রীকে। বরং মা-বাবার সঙ্গে বসে সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করবেন, যদি কোনও সমস্যা হয়। স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলে বিষয়টির সামলানোর চেষ্টা করবেন।’’
পারিবারিক বিবাদের সময়ে স্ত্রীকে কোন কথাটি একেবারেই বলবেন না? ছবি: সংগৃহীত
কেন এমন কথা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে?
আসল বিষয়টি শুধু বাবা-মা বনাম স্ত্রী নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিয়ের পর নতুন একটি সম্পর্ককে কী ভাবে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও। বাবা-মাকে ভালবাসা আর স্ত্রীকে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা এক জিনিস নয়। বিয়ের পরেও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব থেকে যায়। তাঁদের দেখাশোনা করা, প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো কিংবা তাঁদের সঙ্গে থাকা— এ সব নিয়ে প্রত্যেক পরিবারের নিজস্ব পরিস্থিতি রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সেই দায়িত্বের অর্থ হয়ে দাঁড়ায়— স্ত্রীকেই সবসময় নিজের ইচ্ছা, পছন্দ বা অস্বস্তি সরিয়ে রেখে মানিয়ে নিতে হবে। সম্পর্ক বিষয়ক পরামর্শদাতার বক্তব্য অনুযায়ী, এক জন ভাল স্বামী বাবা-মাকে ভালবাসবেন, তাঁদের সম্মান করবেন, কিন্তু একই সঙ্গে স্ত্রীকেও তাঁর জীবনের সমান গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখবেন। অর্থাৎ বিষয়টি ‘কার গুরুত্ব বেশি’, এমন প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নয়।
‘আমার বাবা-মা আগে’— কেন কথাটা বিপজ্জনক?
বিয়ের পর এক জন নারী যখন নতুন পরিবারে আসেন, তখন তাঁকেও নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ এবং নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। সেই সময়ে স্বামী যদি প্রথমেই জানিয়ে দেন যে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই শেষ কথা এবং তাঁকেই সবসময় মানিয়ে নিতে হবে, তা হলে সম্পর্কে নিরাপত্তার অভাব দেখা দিতে পারে। তাঁর মনে হতে পারে, এই সংসারে তাঁর মতামতের মূল্য কম। তাঁর স্বামী তাঁর পাশে নেই। নিজেকে অসহায় বলে মনে হতে পারে। আর সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে অভিমান, দূরত্ব এবং ধীরে ধীরে ক্ষোভ।
আরও পড়ুন:
স্ত্রীকেই কি তবে বাবা-মায়ের আগে রাখতে হবে?
এখানেও বিষয়টি এত সরল নয়। চেতনার মতে ‘স্ত্রীকে বাবা-মায়ের উপরে রাখতে হবে’, এই সহজ নিয়মে দেখলে ভুল হবে। আসল বিষয় হল, পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং প্রত্যেক সম্পর্কের প্রতি সম্মান রাখা। বাবা-মায়ের প্রয়োজন যদি জরুরি হয়, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো স্বাভাবিক। আবার দাম্পত্যজীবনে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে স্ত্রীর মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে।