মাংস রাঁধার সময়ে রান্নার সূত্রপাত ঘটে ম্যারিনেশন পর্বেই। গ্যাসে রান্না চাপানোর অনেক আগে। কারণ এই পর্বের উপরেই নির্ভর করবে পদটির স্বাদ কেমন হবে, মাংসের ভিতরে স্বাদ প্রবেশ করবে কি না, ঝোল কেমন খেতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু জানেন কি, মাংসে মাখিয়ে রাখার পিছনে শুধু স্বাদ বৃদ্ধি নয়, রয়েছে বেশ কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়াও। ঠিক ভাবে মশলা মাখিয়ে রাখলে মাংস রান্নার পরে আরও রসালো, নরম ও সুস্বাদু হতে পারে। আবার মাখানোর পদ্ধতিতে সামান্য ভুল হলেই মাংসের মাংসের স্বাদ থেকে তন্তু পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
অ্যাসিডিক উপাদান (লেবু, ভিনিগার, দই ইত্যাদি), ফ্যাট (তেল) এবং মশলা— মূলত তিনটি উপকরণ দিয়েই মাংস ম্যারিনেট করা হয়। তবে নুন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এ ক্ষেত্রে। কারণ, মাংসের টুকরোর ভিতরে আর্দ্রতা প্রবেশ করানোর কাজটি নুনই করে। ফলে নুনের হেরফেরে মাংস রসালো হতে পারে বা শুষ্ক লাগতে পারে। টকজাতীয় উপাদান মাংসের উপরিভাগের প্রোটিনকে কিছুটা আলগা করতে সাহায্য করে। ফলে মাংসের বাইরের অংশ নরম হয় এবং খেতে তুলনামূলক কোমল লাগে। আর তেল, মশলা ও বিভিন্ন সুগন্ধি উপাদানের স্বাদ মাংসের গায়ে সমান ভাবে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তেল মাংসকে রান্নার সময়ে অতিরিক্ত শুকিয়ে যাওয়া থেকেও কিছুটা রক্ষা করে।
মাংস ম্যারিনেট করার কিছু ভুল। ছবি: সংগৃহীত
ম্যারিনেশনের সময়ে কোন কোন ভুল করবেন না?
১. অতিরিক্ত অ্যাসিড প্রয়োগ: অতিরিক্ত লেবু বা ভিনিগার মিশিয়ে দিলে স্বাদ বেশি ভাল হবে, এটি আদপে ভ্রান্ত ধারণা। এই ধরনের ভুলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাংসের উপরিভাগের প্রোটিন একেবারে ভেঙে যায়। যে কারণে মাংসের বাইরের অংশ নরম হলেও ভিতরটা শক্ত থেকে যায়। তাই ম্যারিনেশনের মিশ্রণে টক উপাদানের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
২. বেশিক্ষণ ম্যারিনেশন: অনেকেই মনে করেন, রাতে মশলা মাখিয়ে রেখে সকালে রান্না করলে মাংস আরও সুস্বাদু হবে। কিন্তু ম্যারিনেশনের সময় নির্ভর করে কোন মাংস রান্না করছেন এবং কী ধরনের মিশ্রণ ব্যবহার করছেন তার উপর। বিশেষ করে মাছ ও সামুদ্রিক খাবার সাধারণত খুব অল্প সময় মাখিয়ে রাখলেই যথেষ্ট, প্রায় ১৫-৩০ মিনিট। মুরগির ক্ষেত্রে প্রায় ২-৬ ঘণ্টা মাখিয়ে রাখা যেতে পারে। আবার টকজাতীয় খাবার দিয়ে ম্যারিনেট করলে বেশিক্ষণ রাখা ঠিক নয়, তাতে মাংসের গঠন খারাপ হয়ে যেতে পারে।
৩. নুন বাদ দেওয়া: মাংস মাখানোর সময়ে অনেকে মশলা, আদা-রসুন, দই, লেবু, সবই দেন, কিন্তু নুন দিতে ভুলে যান অথবা খুব কম দেন। মনে রাখবেন, নুন শুধু স্বাদ বাড়ায় না, মাংসের ভিতরের আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে। ফলে রান্নার পরে মাংস রসালো থাকে।
৪. ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া: মাংস মাখার পর রান্নাঘরেই রেখে দেন অনেকে। কিন্তু সঠিক নিয়ম হল, ম্যারিনেট করার পর ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখা। কম তাপমাত্রা ক্ষতিকর জীবাণুর বাড়বৃদ্ধিকে ধীর করে এবং মাংসকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে। তা ছাড়া আঢাকা রেখে দেওয়ায় ঠিক নয় মেখে রাখা মাংস।
৫. শুকিয়ে না নেওয়া: মশলা মাখানো মাংস সরাসরি গরম কড়াইয়ে ছাড়া হয়। কিন্তু মাংসের গায়ে যদি অতিরিক্ত মিশ্রণ লেগে থাকে, তা হলে সমস্যা হতে পারে। গরম কড়াইয়ে পড়ে অতিরিক্ত তরল থেকে বাষ্প তৈরি হবে। ফলে মাংস ভাজা হওয়ার বদলে সেদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তাই কড়াইয়ে তেলে ছাড়ার আগে মাংসগুলি আলতো করে নরম কাপড় দিয়ে মুছে নেওয়া উচিত। এতে মশলার আস্তরণও থাকবে, কিন্তু অতিরিক্ত জলীয় অংশ থাকবে না।