অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে। আশ্রয় নেন নিরিবিলি, স্যাঁতস্যাতে কোনও জায়গায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এ পর্যন্ত উড়ন্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মাত্র যে তিনটি বংশধারার সন্ধান মিলেছে, তাদের মধ্যে বাদুড় অন্যতম। বর্তমানে পৃথিবীতে বাদুড়ের দেড় হাজারেরও বেশি জীবিত প্রজাতি রয়েছে। কিন্তু এদের আবির্ভাব কোন সময়ে হয়েছিল, তা নিয়ে এত দিন ধোঁয়াশাই রয়ে গিয়েছিল। এ বার সেই ধোঁয়াশা কাটল বাদুড়ের জিন এবং জীবাশ্ম নিয়ে এক মিলিত গবেষণায়।
এখনও পর্যন্ত বাদুড়ের সবচেয়ে পুরনো যে জীবাশ্মটি আবিষ্কার হয়েছে, তার বয়স ৫ কোটি ২০ লক্ষ বছর। জীবাশ্মটি আবিষ্কার হয় আমেরিকায়। কিন্তু তারও বহু আগে বাদুড়েরা এসে গিয়েছিল পৃথিবীতে। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় ডাইনোসরেরা। সাম্প্রতিক গবেষণায় আভাস, ডাইনোসরেরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরপরই আবির্ভাব হয়ে গিয়েছিল বাদুড়দের। আজ থেকে আনুমানিক ৬ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে এরা পৃথিবীতে এসেছিল।
এত দিন মনে করা হত উত্তর আমেরিকা, এশিয়া বা আফ্রিকা মহাদেশের কোথাও বাদুড়দের আবির্ভাব হয়ে থাকতে পারে। তবে নতুন গবেষণা বলছে, ইউরোপেই এদের প্রথম আবির্ভাব হয়েছিল। তার পরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তে। বর্তমানে আন্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশেই এদের বাস রয়েছে।
পৃথিবী জুড়ে বাদুড়ের এত প্রজাতি ছড়িয়ে থাকলেও এদের বিবর্তনের ইতিহাস বোঝা বেশ কঠিন। কারণ এদের জীবাশ্ম খুব বেশি পাওয়া যায়নি। এ বার সেই ধোঁয়াশা কাটাতে বাদুড়দের ১০৩টি প্রজাতির জিনোম এবং ৪৪টি বাদুড়ের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদলের নেতৃত্ব দেন স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ডুজ় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোঞ্জা ভার্নেস, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের অধ্যাপক এমা টিলিং এবং আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গবেষক আরিয়াদনা মোরালেস। গত বুধবার ‘নেচার’ জার্নালে তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় এ-ও দেখা যায়, ওড়ার ক্ষমতার মতো ‘ইকোলোকেশন’ (প্রতিধ্বনির সাহায্যে কোনো বস্তুর অবস্থান, দূরত্ব ও আকার নির্ণয় করার ব্যবস্থা)-ও বিবর্তনের ইতিহাসের একেবারে শুরুর দিকে বিকশিত হয়েছিল। ভার্নেসের কথায়, “উড়তে পারা এবং প্রতিধ্বনির মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয় করার ক্ষমতা এদের বেশ কিছু সুবিধা করে দিত। বিশেষ করে এই ব্যবস্থার কারণেই রাতে খাবারের সন্ধানে বেরোতে শিখেছিল তারা।” একই মত গবেষকদলের অন্যতম প্রধান টিলিঙেরও। “বাদুড়দের নিশাচর হতে সাহায্য করেছিল ইকোলোকেশন ব্যবস্থাই। এটির কারণে পাখিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়নি বাদুড়দের। দিনের বেলা উড়ে বেড়ানো পাখিদের শিকারও হতে হয়নি ওদের।”
নতুন এই গবেষণায় উঠে আসে, ইউরোপ থেকে বাদুড়েরা প্রথমে ছড়িয়ে পড়েছিল আফ্রিকা মহাদেশে। আবির্ভাবের পর খুব কম সময়ের মধ্যেই তারা আফ্রিকায় ঢুকে গিয়েছিল। বাদুড়দের প্রাথমিক বিবর্তন শুরু হয়েছিল এই দুই মহাদেশ থেকেই। তবে উড়তে পারা এবং ‘ইকোলোকেশন’ ব্যবস্থার মধ্যে কোনটি তাদের মধ্যে প্রথম বিকশিত হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আদিমকালের সেই বাদুড়েরা দেখতে কেমন ছিল, তা-ও রহস্যই রয়ে গিয়েছে। টিলিঙের অনুমান, সাড়ে ৬ কোটি বছর আগের সেই বাদুড়েরা হয়ত দেখতে অনেকটা লম্বা আঙুল গজাতে শুরু করা গেছো ছুঁচোর মতো ছিল। তবে এটি শুধুই তাঁর অনুমান। কারণ সবচেয়ে পুরনো যে জীবাশ্মটি (৫ কোটি ২০ লক্ষ বছরের পুরনো) পাওয়া গিয়েছে, সেটিও দেখতে আধুনিক বাদুড়ের মতোই।