Advertisement
E-Paper

যুবভারতীর ভোলবদল, উধাও মাথার জঙ্গল, মেসি-সফরের লজ্জা কী ভাবে মুছতে পারল ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচ

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচের পর ফুটবল বিশ্বের কাছে হারানো মান কিছুটা হলেও ফিরে পেল কলকাতা। তবে পরীক্ষা শেষ হয়নি। আগামী মঙ্গলবার আরও এক বার হ্যাংলামিহীন সুশৃঙ্খল কলকাতাকে দেখতে চাইবে ফুটবল বিশ্ব।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:২৮
Picture of Football

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচে বল দখলের লড়াই। ছবি: এক্স।

১০ মাসের ব্যবধান। অন্য চেহারায় দেখা গেল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনকে। সঠিক পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলা একটি আয়োজনকে কোন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে, তা দেখিয়ে দিল ভারত-ব্রাজ়িল ফিফা প্রীতি ম্যাচ।

লিয়োনেল মেসির কলকাতা সফরের সময় যা যা ঘটেছিল, তার কিছুই ঘটল না শনিবার। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের সঙ্গে মন্ত্রী, আমলা, খ্যাতনামী বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের নিজস্বী তোলার হুজুগ ছিল না। সই নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি ছিল না। টাকা দিয়ে ছবি তোলার ব্যবস্থা ছিল না। যুবভারতীর মাঠ ব্রিগেডের জনসভার চেহারা নেয়নি। রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীও ব্রাজ়িলের কোনও ফুটবলারকে জড়িয়ে ধরে বন্ধুত্ব করতে যাননি।

মেসি এসেছিলেন নিছক শুভেচ্ছা সফরে। খেলতে নয়, তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন প্রিয় দুই সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি পল। ব্রাজ়িল এসেছে ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলতে। কার্লো আনচেলোত্তি ব্রাজ়িলের জাতীয় দল নিয়ে এসেছেন। যে দল নিয়ে আগামী বিশ্বকাপের পরিকল্পনা করছেন, সেই দল নিয়েই কলকাতায় এসেছেন। গত বিশ্বকাপে খেলা ন’জন ফুটবলারকে নিয়ে এসেছেন। এই দলই কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলেছে। ব্যবসায়িক দিক থাকলেও ফুটবলের দৃষ্টিকোণ থেকে দুই সফরের গুরুত্ব আলাদা।

শুধু কি গুরুত্ব আলাদা হওয়ার কারণেই আয়োজনের পার্থক্য? না। আসল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলা। বলা ভাল, ক্ষমতার আস্ফালনহীন প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও খেলা দেখতে এসে ঠিক এই জায়গাতেই খোঁচা দিয়ে গিয়েছেন রাজ্যের পূর্বতন সরকারকে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘মেসি ইভেন্টের সঙ্গে পার্থক্যটা তো দেখলেন। আমাদের কোনও মন্ত্রী বা আমলা মাঠে ঢুকতে যাননি। কেউ সেলফি তুলতে যাননি। মাঠে এক জনও বাড়তি লোক ঢোকেননি।’’ পানামা, ব্রাজ়িল এবং উরুগুয়ের জাতীয় দলকে যে সংস্থা ভারতে এনেছে, তার অন্যতম কর্ণধার সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ম‍্যাচের আগে বলেছিলেন, ‘‘আমরা সতর্ক ছিলাম। মেসি ইভেন্টের মতো ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। সুষ্ঠু ভাবে পরিকল্পনা মাফিক সবটা আয়োজনের চেষ্টা করা হয়েছে।’’

বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-আমলারা যে সংযম দেখালেন, সেটাই দেখাতে পারেননি পূর্বতন সরকারের মন্ত্রীরা। ক্ষমতার দম্ভ এবং সেই দম্ভের আশকারায় লালিত লোভ, হ্যাংলামিই সব আয়োজনে জল ঢেলে দিয়েছিল। কেউ হোটেলে মেসিকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন, কেউ মাঠে। যুবভারতীতে তো আবার মেসিকে পঙ্গপালের মতো অনুসরণ করছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা মানুষ জন! কড়া ‘ম্যান মার্কিং’-এ বিরক্ত মেসি যুবভারতী ছেড়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। তাঁর নিরাপত্তা রক্ষীরাও যুবভারতীর পরিস্থিতি দেখে ঝুঁকি নিতে চাননি।

তেমন অরাজক পরিস্থিতির কিছুই দেখা যায়নি শনিবারের যুবভারতীতে। যে কোনও বড় আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ যে ভাবে আয়োজিত হয়, সে ভাবেই হয়েছে। খেলা শেষে ভিনিসিয়াস, মার্কুইনহোসেরা হোটেলে ফিরেছেন হাসি মুখে। ভারতীয় ফুটবলারদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেছেন। ছবি তুলেছেন। জার্সি বদল করেছেন। সাধারণত এই ধরনের ম্যাচে যা যা হয়, সব হয়েছে। চারটে গোলও হয়েছে। কলকাতার ফুটবলপ্রেমী মানুষ উপভোগ করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ভারত-ব্রাজ়িল প্রথম ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করেছেন। ক্ষমতা ভোগের আকাঙ্ক্ষা ছিল না বলেই উপভোগ্য ফুটবল হয়েছে। ভারতীয় দল জিততে পারেনি ঠিকই, তবে রায়ান উইলিয়ামস, আনোয়ার আলিরা সাধ্যমতো লড়াই করেছেন।

রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ বলেছেন, ‘‘ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচ গোটা বিশ্ব দেখল। দর্শক, প্রশাসন, পুলিশ সকলে মিলে যে ভাবে সুষ্ঠু ভাবে এত বড় একটা ম্যাচ আয়োজন করল। সকলের সহযোগিতাই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজ়িলের কোচ আনচেলোত্তিও আয়োজনের প্রশংসা করেছেন। ওদের মাঠ নিয়ে একটা অসন্তুষ্টি ছিল। কিন্তু গত তিন-চার মাসে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতর এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো একসঙ্গে কাজ করে স্টেডিয়ামকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আনচেলোত্তি বলেছেন, তাঁর মনে হয়েছে কোনও বিশ্বকাপের ম্যাচ হল।’’

কী ভাবে এই সুষ্ঠু আয়োজন? মোট ন’টি কারণ উঠে আসছে।

এক, অপ্রয়োজনীয় উৎসাহ তৈরির চেষ্টা করা হয়নি ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচ নিয়ে।

দুই, মাঠে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। শুধু ভিতরের লাউঞ্জে সুযোগ পেলে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে ছবি তোলার অনুমতি ছিল।

তিন, পুলিশ কর্মীদের দায়িত্ব পালনে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।

চার, গ্যালারিতে বা স্টেডিয়ামের ভিতরে বোতলজাত পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

পাঁচ, টিকিট বিক্রি এবং বন্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। কোনও ভিআইপি টিকিটেই মাঠে ঢোকার ছাড়পত্র ছিল না।

ছয়, পেশাদার ঘোষক নিয়োগ করা হয়। যাঁরা প্রতিনিয়ত মানুষকে সজাগ এবং সতর্ক করেছেন। সময় সময় সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন।

সাত, বেয়ে ওঠা যায় না এমন ফেন্সিং লাগানো হয়েছে মাঠের ধারে। ভাল মানের গেট লাগানো হয়েছে।

আট, পুলিশ কর্মীদের গ্যালারির দিকে সর্বক্ষণ নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মাঠের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয় আধাসামরিক বাহিনীকে। মোতায়েন করা হয়, ‌ভিড় এবং বিশৃঙ্খলা সামলানোয় দক্ষ বাহিনী।

নয়, সর্বক্ষণ গোটা স্টেডিয়ামের পরিস্থিতি নজরে রাখার জন্য ছিল কন্ট্রোল রুম। ৩৪৪টি ক্যামেরায় বিভিন্ন জায়গাকে নজরবন্দি করে রেখেছিলেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীরা। তেমন কোনও সম্ভাবনা দেখলেই নির্দিষ্ট জায়গার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। শুধু গ্যালারিতেই নজর রেখেছিল ১০০টি ক্যামেরা। বিশেষ করে মাঠ, সাজঘর, ফুটবলারদের যাতায়াতের পথে কঠোর নিরাপত্তা ছিল। ক্ষমতা বা বিশেষ সুপারিশের প্রবেশও ছিল নিষেধ।

মেসি ইভেন্টে কেন করা যায়নি এমন ব্যবস্থা? আর্জেন্টিনার প্রাক্তন অধিনায়ককে ভারতে আনার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন শতদ্রু দত্ত। তিনি আগেই পূর্বতন রাজ্য সরকার এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটকে দায়ী করেছিলেন চূড়ান্ত অব্যবস্থার জন্য। তিনি বলেছিলেন, ‘‘পুরো ঘটনাটি ঘটে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের কিছু অফিসারের জন্য। তাঁদের জন্যই সব পরিকল্পনা, ব্যবস্থা বানচাল হয়ে যায়।’’ বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীও তৃণমূল সরকারকে কটাক্ষ করার সুযোগ হাত ছাড়া করেননি। ইন্দ্রনীল বলেছেন, ‘‘মেসি ইভেন্টের সময় চূড়ান্ত অব্যবস্থা দেখা গিয়েছিল। তৃণমূলের মন্ত্রীদের রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী মানসিকতার জন্যই ও রকম হয়েছিল। প্রচুর অনিয়ম হয়েছিল। আর্থিক দুর্নীতি হয়েছিল। স্বজনপোষণ হয়েছিল। তৃণমূল সরকার রাজ্য এবং দেশের মান ডুবিয়েছিল। এখন তৃণমূল সরকারের সময়ের মতো কাটমানি, সিন্ডিকেট, দুর্নীতি, স্বজনপোষন, দখলদারির মানসিকতা নেই। তাই মানুষ ভারত-ব্রাজ়িলের খেলা উপভোগ করতে পেরেছেন।’’

কলকাতা যে পারে, তা দেখিয়ে দিয়েছে ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচ। মেসি, ভিনিসিয়াসেরা প্রতিপক্ষের রক্ষণের পায়ের জঙ্গল কেটে বেরোতে পারেন। মাথার জঙ্গল সামলানোর দক্ষতা তাঁদের নেই। আয়োজন, পরিস্থিতির নিরিখেই তাঁরা বিরক্ত হন বা সন্তুষ্ট হন। আপাদমস্তক পেশাদার মানসিকতার ফুটবলারেরা গায়ে পড়া নেতা-মন্ত্রীদের মনোরঞ্জনের জন্য ফিফা ক্রমতালিকায় ১৩৮ নম্বরে থাকা ভারতে আসেন না। তাঁরা আসেন ফুটবলের জন্য, ফুটবলপ্রেমীদের জন্য। সমর্থকদের কাছে ফুটবলারেরা যেমন ভগবান, ফুটবলারদের কাছেও সমর্থকেরা তাই। শনিবার মাঠে যাওয়া হাজার ৫০ মানুষও হাসি মুখে বাড়ি ফিরেছেন। তেমন বড় অভিযোগ শোনা যায়নি।

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচের পর ফুটবল বিশ্বের কাছে হারানো মান কিছুটা হলেও ফিরে পেল কলকাতা। তবে পরীক্ষা শেষ হয়নি। আগামী মঙ্গলবার দিয়েগো ফোরলানের উরুগুয়ের মুখোমুখি হবে খালিদ জামিলের দল। উরুগুয়েও দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আরও এক বার হ্যাংলামিহীন সুশৃঙ্খল কলকাতাকে দেখতে চাইবে ফুটবল বিশ্ব।

Yuva Bharati Krirangan State Government management

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy