এ বারের বিশ্বকাপে আমেরিকার বিভিন্ন মাঠ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে নিউ জার্সির মাঠ নিয়ে, যেখানে হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল। গ্রুপ পর্বের ম্যাচেই একাধিক দল ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এই মাঠের ঘাস নিয়ে। ফলে ফিফাকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে মাঠ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে।
সেনেগালকে হারানোর পর ফ্রান্সের আদ্রিয়েন হাবিয়ো কঠোর সমালোচনা করেছিলেন মাঠের। বলেছিলেন, “এটা মাঠ না কী, কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল কৃত্রিম ঘাসের মাঠে খেলেছি।” আসলে, আমেরিকায় প্রবল গরমের মধ্যে ম্যাচ হচ্ছে। তাই ঘাস শুকিয়ে যাওয়া অবিশ্বাস্য কিছু নয়। তা ছাড়া আমেরিকার মাঠগুলি সে দেশের ফুটবল লিগের (যা খেলা হয় ডিম্বাকৃতি বলে) জন্য তৈরি। সেখানেই ফুটবল হচ্ছে। কিছু কিছু মাঠ কৃত্রিম ঘাস দিয়ে তৈরি। সেগুলির পর সাধারণ ঘাস পাততে হয়েছে। সব মাঠের পরিবেশ সমান নয়।
মাঠ তৈরি করার জন্য বিস্তারিত গবেষণা করেছে ফিফা। তাদের নিজস্ব মাঠ পরিচালন দল বিশ্বকাপের সব মাঠ তৈরি করেছে। তার নেতৃত্বে ছিলেন অ্যালান ফার্গুসন। ২০১৮-য় গবেষণা শুরু হয়েছিল। টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ড. জন সোরোকান এবং ড. ট্রে রজার্স সহায়তা করেছেন।
ফিফা মাঠ যে নিয়ে পরিশ্রম করেছে তা প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু বাকি বিষয়ের মতো মাঠ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফুটবলে এখন তথ্য এবং প্রযুক্তির উপর প্রতিনিয়ত জোর দেওয়া হচ্ছে। তা হলে মাঠ তৈরির ক্ষেত্রে সেটা কেন হবে না?
মাঠ বিশেষজ্ঞ একটি সংস্থার কর্তা ক্রিশ্চিয়ান থিল বলেছেন, “ফিফা নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সব মাঠে ধারাবাহিকতা আনতে চেয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও সহজ নয়। আপনি যদি অস্থায়ী মাঠ তৈরি করেন, তা হলে সেটা স্থায়ী মাঠের মতো আচরণ করবে এমনটা ভাবা ভুল।”
থিলের সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন মাঠের ঘাস এবং পরিবেশ নিয়ে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান করে। প্রিমিয়ার লিগ, বুন্দেশলিগা, এমএলএস-এর সঙ্গে কাজ করে তারা। প্রযুক্তির সঙ্গে মাটি ও ঘাস গজানোর বিজ্ঞান মিলিয়ে নিজেদের মতো করে মাঠ তৈরি করে তারা। মাথায় রাখা হয় আবহাওয়া, গরম, বল গড়ানোর গতি এবং বল লাফানোর মতো বিষয়কেও। ফলে মাঠ তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রায় নিখুঁত ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
তবে এই প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, মাঠের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রকম আচরণ করে। ১৯টি জায়গা দেখে কখনওই বোঝা সম্ভব নয় গোটা মাঠের আচরণ একই হবে। দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়া ১০০ শতাংশ নিখুঁত হলেও, পাঁচ মিনিট জল দেওয়া হলে মাঠের চরিত্র বদলে যেতে পারে।
ঘাসের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে ঠিক করা হয় কোন ঘাস ব্যবহার করা হবে। গরমের জন্য বারমুডা ঘাস ব্যবহার করা হয়। ঠান্ডার জন্য কেন্টাকি ব্লুগ্রাস বা রাইগ্রাস ব্যবহার করা হয়। এই ঘাসের সঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবলারেরা বেশি স্বচ্ছন্দ। নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বারমুডা ঘাস ব্যবহার করা হয়। ফলে ইউরোপীয়েরা একেবারেই স্বচ্ছন্দ নন এই ঘাসের সঙ্গে।
মাঠের ঘাসের সঙ্গে হয়তো দর্শকদের সরাসরি সংযোগ নেই। কিন্তু তাঁরা মাঠে এসে ভাল খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। মাঠের পরিবেশ ভাল না হলে ফুটবলারেরাও ভাল খেলতে পারবেন না। মরক্কো ম্যাচের পর ব্রাজ়িলের ভিনিসিয়াস বলেছিলেন, “আবহাওয়া এবং গরমের জন্য ঘাস দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছিল। ফলে খেলা ধীরগতির হয়ে যাচ্ছিল। আমরা ছন্দ তৈরিই করতে পারিনি।”
নরওয়ের কোচ স্টেল সলবাকেন বলেছিলেন, “মাঠ দেখে মনে হয়েছে কৃত্রিম ঘাসের তৈরি। খুব ছোট এবং নীচটা শক্ত। যারা বল ধরে রেখে খেলতে ভালবাসে তাদের জন্য কাজটা কঠিন। ঘাস শুকনো হলে ভাল খেলা খুবই কঠিন।”
এ ধরনের মাঠে খেলা হলে ফুটবলারেরা চোটও পেতে পারেন। তাই সেই সম্ভাবনা যাতে না থাকে তার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। থিলের সংস্থা ‘টার্ফকোচ’ সেই প্রযুক্তি নিয়েই কাজ করে। নির্দিষ্ট মাঠে কোন জুতো পরে খেলতে হবে সেটাও ঠিক করে তারা। ভাল ফুটবল খেলার নেপথ্যে সঠিক জুতো পরাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:
-
৩৪ বার বল পেয়েছেন, গোলে একটিও শট নেই, বিশ্বকাপ থেকে ফ্রান্সের বিদায়ের নেপথ্যে ‘খলনায়ক’ এমবাপে
-
যে কোনও মূল্যে মেসিকে থামাও, দলকে নির্দেশ টুখেলের, আর্জেন্টিনার পয়া নীল জার্সি পরার কারণও জানেন ইংল্যান্ড কোচ
-
৫ লড়াই: আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচে যে দ্বৈরথগুলির দিকে নজর থাকবে ফুটবলবিশ্বের
-
বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার মন্ত্র দলকে শিখিয়েছেন স্কালোনি, ইংল্যান্ডকে হারানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন মেসিদের কোচ
থিল বলেছেন, “নিখুঁত জুতো শুধু মাঠের উপরে নির্ভর করে না। ফুটবলারের উপরও নির্ভর করে। প্রত্যেকের পায়ের মাপ, গোড়ালি এবং চোটের ধরন আলাদা। মাঠের কোন পজিশনে সে খেলছে সেটাও দেখতে হবে। সঠিক জুতো নির্ধারণ করার জন্য এর সব ক’টাই জরুরি। আপনার কাছে তথ্য থাকলে বিশ্লেষণ করা সহজ। অনুশীলনের পর আমাদের কাছে ফুটবলারেরা এসে নিজের জুতো সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া দেয়। ওদের কথা শুনে এবং মাঠ সম্পর্কে আমাদের তথ্যের উপর ভিত্তি করে, পরের ম্যাচে ওদের কোন জুতো পরে নামা উচিত সেই পরামর্শ দেওয়া হয়।”
কম চোট পেলে সেরা অবস্থায় ফুটবলারদের দেখতে পাওয়া যায়। তার জন্য সঠিক অবস্থায় মাঠ রাখতে হবে। সেই কাজে ফিফা সর্বদা তৎপর। তার পরেও এড়ানো যাচ্ছে না বিতর্ক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। রবিবার নিউ জার্সিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে খেলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে তারা।
- বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে স্পেন। প্রতিযোগিতা শেষে চার পুরস্কার গেল কাদের ঝুলিতে?
- লিয়োনেল মেসি থাকার পরেও শেষরক্ষা হল না আর্জেন্টিনার। স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারতে হল। মেসিদের হারের পাঁচ কারণ কী কী?
-
চারটি আত্মঘাতী বোমায় মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার ছক! বিশ্বকাপের সময় আমেরিকায় জঙ্গিহানার পরিকল্পনা ফাঁস
-
স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনালই শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল ভিনচিচের, বিশ্বকাপের সেরা রেফারি খেলাতে এসেছিলেন ভারতেও
-
বিশ্বকাপ শেষের পাঁচ দিন পরেও বিতর্ক থামার নাম নেই! লাল কার্ড নিয়ে ট্রাম্পের নাক গলানোয় নতুন করে সুর চড়াল হালান্ডের নরওয়ে
-
ফাইনালে হেরে গিয়েও ২০৩০ বিশ্বকাপেও জায়গা পাকা করে নিল আর্জেন্টিনা! নেপথ্যে ফিফার সিদ্ধান্ত
-
বিশ্বকাপের সেরা একাদশ বাছল ফিফা, চার জায়গায় একমত নই আমরা! কোন ১১ জনকে রাখল আনন্দবাজার ডট কম