উপত্যকা যেন নীল চাদরে মোড়া। আর সেই রূপের টানে ছুটে আসছেন পর্যটকেরা। সেই রূপে বিভোর হয়ে উদ্যোগপতি হর্ষ গোয়েঙ্কা সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘১২ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে দেখা মিলল সেই অনবদ্য দৃশ্যের! মুন্নারের পাহাড়ি ঢালে ফের ফুটেছে দুর্লভ নীলকুরিঞ্জি, আর তাতেই পশ্চিমঘাট ঢেকেছে বেগনিরঙা গালিচায়।’’
নীলকুরিঞ্জি ফুটেছে মুন্নারে। ছবি: হর্ষ গোয়েঙ্কার ইনস্টাগ্রাম পোস্ট থেকে সংগৃহীত।
এই দৃশ্য দুর্লভই বটে। কারণ, নীলকুরিঞ্জি ফোটে প্রতি ১২ বছরে এক বারই। তবে এই বার ছক ভেঙে কার্যত চার বছর আগেই ফুটল সেই ফুল। ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমান্তরালে রয়েছে দীর্ঘ পর্বতশ্রেণি, যা পশ্চিমঘাট পর্বতমালা নামে পরিচিত। তারই অংশবিশেষ নীলগিরি পর্বতমালা। নীলগিরি নামের পিছনেও রয়েছে নীলকুরিঞ্জি ফুল। ১২ বছর অন্তর যখন বিস্তীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা জুড়ে এই ফুল ফোটে, পাহাড় দেখায় ঘন নীল। কেউ কেউ বলেন, তা থেকেই নাম নীলগিরি অর্থাৎ নীল পাহাড়। নীলকুরিঞ্জি ফোটে পশ্চিমঘাটের ঘাসজমিতে। যখন শয়ে শয়ে সেই ফুল ফুটে থাকে, মনে হয় কেউ যেন নীল-বেগনি গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
তথ্য বলছে, মুন্নারের এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে শেষ বার এই নীলরঙা ফুল ফুটেছিল ২০১৮ সালে। ফুলপ্রেমীদের ক্যালেন্ডারে লেখা ছিল, পরের বার সেই স্বর্গীয় রূপদর্শন হবে ২০৩০-এ। তবে ১২ বছরের ব্যবধানের আগেই ফুটল ফুল। কেন এই ছকভাঙা কাণ্ড?
কিন্তু অন্য তথ্য বলছে, হিসাবে গরমিল নেই মোটেই। কারণ, এবার নীল গালিচায় ঢাকেনি এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান। ফুল ফুটেছে দেবিকুলম ফরেস্ট রেঞ্জের মাট্টুপ্পেট্টি ও চোক্রমুডির কাছাকাছি অবস্থিত কোরনদকড পাহাড়ি ঢাল জুড়ে।
জানা গিয়েছে, মুন্নারের যে অংশে ফুল ফুটেছে, সেখানে নীলকুরিঞ্জি মোটামুটি ১২ বছর আগেই ফুটেছিল। এই অঞ্চলে ২০১৪ সালে শেষ ফুল ফুটেছিল। তাই অঙ্কের হিসেব ঠিকই আছে।
মুন্নারে নীল ফুল ফোটার বিস্তৃতি প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জুড়ে। এক বার ফুল ফুটলে মোটামুটি মাস তিনেক তা স্থায়ী হয়। ভ্রমণের শখ থাকলে এই বেলা ঘুরে আসতে পারেন মুন্নারে। কেরলমের শৈলশহরটির সবুজ রূপ, উপত্যকা জুড়ে বিস্তৃত চা-বাগিচার শোভা বছরভরই দেখা যায়, তবে নীল-বেগনি ফুলের সৌন্দর্য চাক্ষুষ করা একপ্রকার দুর্লভই।
কী ভাবে সাজাবেন ভ্রমণসূচি?
ভ্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাক মুন্নার। কোচি বিমানবন্দর বা এর্নাকুলাম স্টেশন থেকে সড়কপথে পৌঁছোনোই সুবিধাজনক। মুন্নার থেকে মাট্টুপ্পেট্টি জলাধারের দূরত্ব মোটামুটি ১৫ কিলোমিটার। চোক্রমুডির দূরত্ব ২২-২৫ কিলোমিটারের মতো। মুন্নার শহরে থেকে গাড়ি করেই দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে নিতে পারেন। চাইলে অভিজ্ঞ গাইডের সাহায্যও নিতে পারেন। মুন্নার-মাট্টুপ্পেট্টি রোডের কোরনদকডে ফুল দেখার সুযোগ রয়েছে। প্রবেশমূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৫০ টাকা, ১৮ বছরের কম বয়সিদের জন্য ১০০ টাকা। ৫ বছরের নীচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে। তবে এই ফুল ছেঁড়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই স্থানে প্লাস্টিকের বোতল বা বর্জ্য ফেললেও প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা নিতে পারে।
শুধু ফুল নয়, মুন্নারে একাধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। মুন্নার ভাল ভাবে দেখতে হলে অন্তত দু’টি দিন হাতে রাখা ভাল। মাট্টুপ্পেট্টির দিকেই যেহেতু নীলকুরিঞ্জি ফুটেছে, তাই সেখানে যাওয়ার সময় মাট্টুপ্পেট্টির টলটলে পান্না-সবুজ জলে নৌকায় ভেসে পড়ুন। এর পর ইকো পয়েন্ট দেখে চলে আসুন কুন্ডলা লেক।
পাহাড়ের ঢালে নীলকুরিঞ্জি ফুল। ছবি:সংগৃহীত।
শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ১৭০০ মিটার উচ্চতায় মুন্নারের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে দিগন্তবিস্তৃত পশ্চিমঘাট পাহাড় আর মেঘ-কুয়াশার খেলা দেখুন। এ ছাড়া ৯ কিলোমিটার দূরে দেখে নিতে পারেন আট্টুকাল জলপ্রপাত। প্রথম দিনের সফর শেষ হবে পোথোমেডু ভিউ পয়েন্টে। সূর্য ডোবার পালা শেষ করে ফিরুন হোটেলে।
দ্বিতীয় দিন ঘুরে নিন এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান। অনেকেই একে রাজামালাই নামে চেনেন। এই স্থান নীলগিরি থার নামে একপ্রকার পাহাড়ি ছাগলের বাসস্থান। দেশের মধ্যে একমাত্র এই পাহাড়ি অভয়ারণ্যেই তার দেখা মেলে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ ছাড়া সারাবছরই অরণ্য খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পারমিট নিয়ে বনবিভাগের মিনিবাসে রোমাঞ্চকর বনভ্রমণ উপভোগ করুন। অগ্রিম অনলাইন টিকিট কেটে নিতে পারেন। বন দফতরের বাসে ভিতরে ঘোরা যায়। কিছুটা অংশ হেঁটে দেখার সুযোগ থাকে।
মুন্নার ভ্রমণ শেষ করে ৪২ কিলোমিটার দূরে মরয়ুরের পথেও যেতে পারেন। এই পথেই দেখা মিলবে লাক্কোম জলপ্রপাতের। জনপ্রিয় পিকনিক স্পট এটি। মরয়ুরে আরও কিছু দ্রষ্টব্য রয়েছে। সেই সব দেখে কোচি বা এরনাকুলমে সরাসরি পৌঁছে যেতে পারেন। কিংবা মরয়ুরে রাত্রিবাসের পরিকল্পনাও রাখতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন?
কোচি বিমানবন্দর থেকে মুন্নারের দূরত্ব প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। সড়কপথে মুন্নার পৌঁছোতে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। এরনাকুলম রেলস্টশন থেকে মুন্নারের দূরত্ব প্রায় ১২৫-১৩০ কিলোমিটার।
কোথায় থাকবেন?
মুন্নারে থাকার জন্য একাধিক হোটেল, হোম স্টে রয়েছে। বিভিন্ন মানের হোটেলও মিলবে এখানে।