ছুটি! তাতে কী? পাহাড়ের রূপে সবে মুগ্ধ হয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে টুং করে মেসেজ! এই মেল ঢুকছে, নয়তো কোনও সহকর্মী কাজের বিষয়ে জরুরি বার্তা পাঠাচ্ছেন। অফিস, কাজ থেকে পুরোপুরি মুক্তি, সে যেন অসম্ভব।
কোভিডকালে জনপ্রিয় হয়েছিল ওয়ার্ক ফ্রম হোম। আর এখন ওয়ার্ক ফ্রম ‘এনি হোয়ার’ হয়ে গিয়েছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম এভরি হোয়ার’। অর্থাৎ যে কোনও জায়গা থেকে কাজ করার সুবিধা যেমন মিলেছে, তেমনই কোনও জায়গায় গেলেই কাজ পিছু ছাড়ছে না। আর সেই যোগসূত্র তৈরি করছে ইন্টারনেট।
এই সব কারণেই নতুন প্রজন্মে মজেছে ‘উধাও ভ্রমণ’-এ। ভাবছেন, এ কোনও অচেনা-অজানা জায়গায় উধাও হয়ে যাওয়া? চলে যাওয়া নেটওয়ার্কের বাইরে? ভাবনায় খানিক ভুল হল। নেটওয়ার্কের পুরোপুরি বাইরে নয়, আবার ভিতরেও নয়, সম্প্রতি জনপ্রিয় হচ্ছে এক মধ্যমপন্থা।
ইন্টারনেট যেমন এখন পেশাগত কাজের সঙ্গে জুড়ে, তেমনই দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গেও। বছর ২৫ আগেও ইন্টারনেট কী জানতেন না বেশির ভাগ লোকে। আর এখন এক কাপ চা খেয়ে টাকা দিতে হলেও লাগবে মোবাইল, ইন্টারনেট সংযোগ। গন্তব্যে পৌঁছোতে হবে, দরকার গুগ্ল ম্যাপ। ট্রেনের টিকিট থেকে হোটেলের বুকিং— সবই হয় মোবাইলে। আর হোটেল খোঁজা থেকে সবচেয়ে ভাল ক্যাফের অনুসন্ধান? ত্রাতার ভূমিকায় সেই ইন্টারনেটই। কিন্তু ইন্টারনেট থাকলে অফিসের মেসেজ থেকে মেল, আটকাবেন কী করে? সেই কারণেই বেড়ানোর নতুন পন্থা। তা বলছে, ইন্টারনেটের ব্যবহার হবে, তবে তা শুধু বেড়ানোর প্রয়োজনে। বাকি সময়টুকু নিজেকে ডিজিটাল জগৎ থেকে মুক্ত রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, কেজো জায়গাগুলিকে কয়েক দিনের জন্য ‘অ-কেজো’ করে রাখাই এই মধ্যম পন্থা।
আরও পড়ুন:
কাজের জগৎ থেকে পুরোপুরি মুক্তি কি সম্ভব?
বেড়াতে গেলেও যতই চেষ্টা করুন না কেন, ইমেল হোক বা কাজের মেসেজ এসে পড়বেই। হয়তো মেল দেখলেন বা দেখলেন না। হয়তো সেই মেসেজের উত্তরও দিলেন না। কিন্তু মনের মধ্যে রয়েই গেল, কাজের কথা। কিংবা বলা ভাল, প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন কাজের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির যে ভাবনাটি ছিল, সেটি থমকে গেল। তা যাতে না হয়, ভ্রমণের নয়া ধারা বলছে, সে জন্য কাজের জগতের যাবতীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। যাতে চেষ্টা করলেও কয়েকটি দিন মেসেজ না ঢোকে। ইমেল বাক্সে তাকাতেও না হয়।
কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করতে হবে না। ক্যাফে খোঁজা বা সেই অঞ্চলের সেরা খাবারটি খোঁজার জন্য মোবাইল চালু থাকবে। তবে মেসেজ বা নোটিফিকেশন বিরক্ত করবে না। আরও কয়েকটি শর্তও আছে। কাজের জগৎ হোক বা দৈনন্দিন জীবনযাপন, মোবাইলই হয়ে যায় কাজ বা অবসরের কেন্দ্রবিন্দু। এই পন্থা বলে, নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে স্ক্রিন টাইম থেকেও। বেড়াতে গিয়ে রিল, ভিডিয়ো বা সমাজমাধ্যমে ছবি পোস্ট করায় ডুবে থাকা নয়, বরং মধ্যমপন্থা বলছে, মোবাইলটি তখনই হাতের কাছে রাখতে হবে, যখন ভ্রমণ সংক্রান্ত কাজে বা জরুরি ফোনের জন্য তার দরকার হবে। বাকি সময় মোবাইল থাকবে শুধুই ছবি তোলার জন্য।
নতুন ভ্রমণ ধারার লক্ষ্য
নতুন প্রজন্মের জীবিকার ধরন বদলেছে। যার ফলে, বেড়ানো বা ছুটির সময়েও কাজ থেকে পুরোপুরি মুক্তি অসম্ভব হয়ে উঠছে দিনে দিনে। কিন্তু কখনও কখনও মানসিক ভাবে ক্লান্তি কাটানোর জন্যই কাজ থেকে পুরোপুরি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার দরকার হয়। ভ্রমণের এই ধারণাটি সেই ভাবনাকেই প্রশ্রয় দেয়।
অনেকেই মানসিক শান্তির জন্য পাহাড় বা শান্ত পরিবেশে যাওয়ার ভাবেন, যাতে ছুটির দিনে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো যায়। কিন্তু সেখানেও কাজ সংক্রান্ত বার্তা, ইমেল আসতেই থাকে। কাজের সময় কাজ, তার পরে নয়, সেই বার্তাকে আরও দৃঢ় ভাবে স্থাপন করতেই এই মধ্যমপন্থা।
এই ‘উধাও ভ্রমণ’ আসলে যে যথেষ্ট জরুরি, বলছেন মনোবিদেরাই। কারণ, কাজের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি না ঘটলে, কাজ সংক্রান্ত মানসিক চাপ কাটানো সম্ভব নয়। ব্যস্ত জীবন, দীর্ঘ ক্লান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি, আরাম এবং নিশ্চিন্তে ঘুমও এমন ভ্রমণের লক্ষ্য। ভ্রমণ মানেই শুধু জায়গা খুঁজে ঘোরা নয়, বরং প্রকৃতির স্পর্শে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা। নিজেকে সময় দেওয়া। সেই উদ্দেশ্য যাতে পূরণ হয়, সেটাই লক্ষ্য।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ধরনে যত বদল হচ্ছে, মানসিকতাতেও বদল অনিবার্য হয়ে উঠছে। মূলত, মুক্তির পথ খুঁজতেই তৈরি হচ্ছে এমন ধারণা, যেখানে বেড়ানো হবে নিখাদ। ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে ডিজিটাল ডিটক্স নয়, বরং কর্মজগৎ থেকে ‘ডিটক্স’ করার মানসিকতাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম।