তরুণী ইঞ্জিনিয়ারের পানীয় জলে বিষ মেশাচ্ছিলেন সহকর্মী যুবক। ক্যাডমিয়াম মিশিয়ে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছিলেন জলে। ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। ঘটনাটি আমেরিকার। সেই ঘটনার একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। ভাইরাল হয়েছে ভিডিয়োটি। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাডমিয়াম দিয়ে প্রাক্তন সহকর্মীকে বিষপ্রয়োগের দায়ে দোষী সাব্যস্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ওই যুবক প্রবেশন বা পরীক্ষামূলক নজরদারির আওতাধীন থাকার মেয়াদ শেষ করেছেন। গুরুতর অপরাধের সাজা খারিজ করার আবেদনও করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
৪১ বছর বয়সি ডেভিড জু এই সাজা খারিজের আবেদন জানাতে অ্যালামেডা কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে হাজির হবেন বলে জানা গিয়েছে। যদিও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় তাঁর এই আবেদনের বিরোধিতা করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইন অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক নজরদারির সমস্ত শর্ত পূরণ করলে আদালতকে সাধারণত এই ধরনের আবেদন মঞ্জুর করতে হয়।
জু-এর ঘটনাটি ২০১৭ সালের, যখন তার সহকর্মী ধাতুবিদ রং ইউয়ান গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। ইউয়ান ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ‘বার্কলে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চ’ সংস্থায় যোগ দেন, যা একটি ফরেনসিক ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম। জু সেখানেই কাজ করতেন। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ইউয়ান। প্রথমে বমি বমি ভাব এবং চুল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয় তাঁর শরীরে। বার বার গুরুতর অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন।
আরও পড়ুন:
২০১৭ সালের জুলাইয়ে ইউয়ান তাঁর জলের বোতল থেকে কয়েক চুমুক জল পান করার পর হঠাৎ অনুভব করেন যে তিনি যেন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন। এক সহকর্মী তাঁকে দ্রুত জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। পরবর্তী মাসগুলিতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে। ফলে কর্মস্থলে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতে শুরু করেন তিনি। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ইউয়ানের মা ইউয়ানের অফিসের বোতল থেকে জল খাওয়ার সময় সেই জলে এক অস্বাভাবিক টক স্বাদ অনুভব করেন। এর পর ইউয়ান একটি গোপন নজরদারি ক্যামেরা কিনে তাঁর ডেস্কের কাছে বসান।
সেই ক্যামেরায় ধরা পড়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য। ভিডিয়োয় দেখা যায়, ইউয়ানের ডেস্কের দিকে এগিয়ে আসছেন জু এবং যে জায়গায় বোতলটি রাখা ছিল সে দিকে হাত বাড়াচ্ছেন। অন্য একটা রেকর্ডিংয়ে জু-কে একটি ছোট সাদা পাত্র থেকে কোনও এক পদার্থ ইউয়ানের বোতলে ঢালতে দেখা যায়। তা দেখে রক্ত হিম হয়ে যায় ইউয়ানের। নিজের প্রতিক্রিয়ার কথা জানাতে গিয়ে ইউয়ান কর্তৃপক্ষকে বলেন, ‘‘আমার রক্ত যেন হিম হয়ে গিয়েছিল। আমি প্রায় মরতে বসেছিলাম। বহু বার মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি ওঁকে কোনও ভাবেই ছাড়তাম না।’’ এর পরেই ওই ভিডিয়োগুলি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন জু। তদন্তকারীরা ইউয়ান এবং তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে নেওয়া জল এবং রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে সবকটিতেই ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
আরও পড়ুন:
২০১৯ সালের মার্চে আলামেডা কাউন্টির সরকারি আইনজীবীরা জু-র বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ভাবে হত্যার চেষ্টা এবং বিষ প্রয়োগের দু’টি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনেন। জিপিএস নজরদারির শর্তে ২০ লাখ ডলারের জামিনে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে আইনি কার্যক্রম চলাকালীন তার পেশাগত লাইসেন্সের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক বছরে আদালত ধীরে ধীরে জু-র উপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং এক পর্যায়ে তাঁকে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের অনুমতি দেয়। তাঁর গৃহবন্দি থাকার আদেশও তুলে নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির প্রস্তাবিত একটি সমঝোতা চুক্তির আওতায় জু বিষ প্রয়োগের একটি অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগ অস্বীকার না করার আবেদন করেন। এই চুক্তির শর্তাবলির মধ্যে ছিল এক বছরের গুরুতর অপরাধের দায়ে নিয়মিত নজরদারি এবং ইতিমধ্যে অতিবাহিত সময়কে সাজা হিসেবে গণ্য করা। তবে সেই সমঝোতা চুক্তি সমালোচনার মুখে পড়ে, যার মধ্যে রায় প্রদানকারী বিচারকের কর্মপদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৪ সালের মার্চে বিচারক কিম্বার্লি কোলওয়েল জু-এর ‘প্রবেশন’ বা পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের মেয়াদ বাড়িয়ে দু’বছর করেন।
আরও পড়ুন:
ইউয়ান ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ৫,০০,০০০ ডলার দাবি করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে মাত্র ৭,০৫৮ ডলার প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। জু-এর আইনজীবীরা এক জন বিষক্রিয়া বিশেষজ্ঞের (টক্সিকোলজিস্ট) একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে ক্যাডমিয়াম বিষক্রিয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনও স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয় না। যদিও ইউয়ান সেই প্রতিবেদনের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।
২০২৬ সালের মার্চে পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের মেয়াদ পূর্ণ করেছেন জু। মামলাটি সফল ভাবে খারিজ হয়ে গেলেও মামলার রেকর্ড পুরোপুরি মুছে যাবে না। অন্য দিকে ইউয়ান জানান যে তিনি এখনও ক্যাডমিয়ামের বিষক্রিয়ায় স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। পূর্ণকালীন কাজ করতে পারছেন না। এ ছাড়া তিনি সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন যেখানে তাঁর এবং পরিবারের উপর ক্যাডমিয়াম বিষক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণাটি ইউয়ান তাঁর বাবার স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন, যিনি গত বছর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ইউয়ান আশা করেন, এই গবেষণাটি চিকিৎসকদের ক্যাডমিয়াম বিষক্রিয়া দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। তাঁর কথায়, ‘‘আইন-আদালত আমাকে আগেই হতাশ করেছে। এটিই আমার শেষ ভরসা।’’ বার্কলে পুলিশ সার্জেন্ট জেনিফার উইলসন, যিনি এই মামলার তদন্ত করেছিলেন, ইউয়ানের দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন। তিনি জানান, শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়া সত্ত্বেও ইউয়ান লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।