কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির মণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনহারাদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক জায়গায় গিয়ে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক সাহায্যের কথাও ঘোষণা করেন তিনি। গোটা ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটিকে।
দশমীর দিন মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই যান ঘোলা থানার যোগেন্দ্রনগরে মৃত প্রিয়া সমাদ্দারের বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক তথা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী, জেলাশাসক-সহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। প্রিয়ার ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রিয়ার বাবা শ্যামল সমাদ্দার পেশায় দর্জি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রিয়ার মা দীপা সমাদ্দার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং তাঁর বয়স ৩৬ বছর। তাই তাঁকে স্থানীয় বিডিও অফিসে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য জেলাশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, দীপা স্কুটি চালাতে জানলে এবং লাইসেন্স থাকলে যাতায়াতের সুবিধার জন্য তাঁকে একটি স্কুটি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকারের তরফে ২৫ লক্ষ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা— মোট ২৭ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পেয়েছে পরিবারটি। প্রিয়ার মায়ের কথায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের ওই ২ লক্ষ টাকা তাঁর ছোট মেয়ের নামে দেওয়া হয়েছে। শোকার্ত দীপা বলেন, “যে চলে গেছে, তাকে তো আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না। বিডিও অফিসে চাকরির ব্যবস্থা করার কথা আমাদের জানানো হয়েছে।” এই কঠিন সময়ে পরিবারটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দিকে নজর রাখতে স্বাস্থ্য দফতরকে এক জন আশাকর্মী নিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রিয়ার বাড়ির পর বরানগরে মৃত দম্পতি দিলীপ ঘোষ ও দিপালী ঘোষের বাড়িতে যান মুখ্যমন্ত্রী। বাবা-মাকে হারানো ছেলের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, দম্পতির মৃত্যুতে রাজ্য সরকারের তরফে ৫০ লক্ষ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ৪ লক্ষ টাকা (মোট ৫৪ লক্ষ) সরাসরি ওই তরুণের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ওই তরুণের দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব তিনি নিজে নিতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আগরপাড়ায় মৃত প্রাঞ্জল সরকারের বাড়িতেও যান শুভেন্দু। জানতে পারেন প্রাঞ্জল অত্যন্ত প্রতিভাবান ছেলে ছিল। দুর্ঘটনার দিন তাঁর বাবা-মা বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তাঁরা যেহেতু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, তাই তদন্ত কমিটির কাছে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রাঞ্জলের বাবা অনুকূল সরকার বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। যাদের গাফিলতিতে ঘটনাটি ঘটেছে তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না বলে কথা দিয়েছেন তিনি। নিজের ব্যক্তিগত হোয়াট্স্যাপ নম্বর দিয়েছেন আমাকে। সরকারি চেকের পাশাপাশি আমার স্ত্রীকে একটি সরকারি কাজের ব্যবস্থা করে দেবার কথাও বলেছেন।” অনুকূল আরও জানান তাঁর বছর তেরোর ছেলে প্রাঞ্জল জাতীয় স্তরের সাঁতারু ছিল। ছেলের লক্ষ্য পূরণে যে সব পরিকাঠামোগত বাধার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন সেই সংক্রান্ত একটি চিঠি তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়েছেন। ভবিয্যতে যাতে অন্যদের হয়রানি না হতে হয় সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর এই চিঠি।
এ ছাড়া, নিউটাউনের গৌরাঙ্গনগরে মৃত তানিয়া বিশ্বাস ও বর্ণালী হালদারের পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, মৃত মুজ়ফ্ফরপুরের বাসিন্দা অভিষেক শ্রীবাস্তব (৩৮) ও আয়াংশ কুমার শ্রীবাস্তবের (৭) পরিবারের কাছে যাওয়া সম্ভব না হলেও জেলাশাসকের মাধ্যমে সেখানে ক্ষতিপূরণের টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
চোরবাগানের দুর্ঘটনার তদন্ত প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এক জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এই ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখবে। দুর্ঘটনার নেপথ্যে মণ্ডপে কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা বা অন্য কোনও কারণ ছিল কি না, তা তদন্তকারী দলই চূড়ান্ত করবে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি ওই কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, “গতকাল ছ’টি পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছি। ১৮টি পরিবারের সঙ্গেই আমি দেখা করব।”