‘রেখাদি’র হুইস্লের আওয়াজে সকালে ঘুম ভাঙে এলাকাবাসীর। ঘুমচোখে নীল-সবুজ প্লাস্টিকের পাত্রে ভরা গৃহস্থালির দৈনন্দিন আবর্জনা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন একে একে। ঢেলে দেন ‘ময়লাগাড়ি’তে। রেখার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বলতে ওইটুকুই। কিন্তু তার পরেও প্রৌঢ়া সাফাইকর্মীর সঙ্গে সকলের বন্ধন আলাদা। তিনি অসুস্থ হয়ে একদিন কাজে না গেলে খোঁজ করেন প্রতিবেশীরা। ফোন করে জানতে চান, শরীর ভাল আছে তো? কিছু কী লাগবে?
উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে বাড়ি রেখা চট্টোপাধ্যায়ের। মাস কয়েক আগে মারা গিয়েছেন স্বামী অজয় চট্টোপাধ্যায়। অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শরৎনগরে আবর্জনা সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। পর পর স্ট্রোক হয়েছিল। তার পর দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সংসার চালাতে হবে তো! সেই থেকে স্বামীর তিনচাকার ময়লা গাড়ির প্যাডলে পা রেখেছেন রেখা। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি এলাকা পরিষ্কারের কাজ করতে তিনচাকার যানের হ্যান্ডলে হাত রেখেছেন ‘নির্মল বন্ধু’।
সকাল ৭টা বাজলেই স্বামীর ভ্যানরিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রেখা। বাড়ি বাড়ি ঘুরে নোংরা-আবর্জনা সংগ্রহ করেন। তবে এলাকাবাসীর প্রিয় রেখাদি কেবল ‘নির্মল বন্ধু’ নন, অদ্ভুত ভাবে সকলের সঙ্গে বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছেন। কারণ হয়তো সদালাপী এই মহিলার জীবন সংগ্রাম।
ঘরকন্না সামলানো সাধারণ বধূ ছিলেন রেখা। ছোটবেলায় ভাল করে সাইকেল শেখা হয়নি। কিন্তু ওই যে... সময়ের দাবি। সংসার চালাতে হবে। স্বামীর অসুস্থতার জন্য কাজটা যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায়, এই ভেবে তাঁর তিনচাকার বাহনকে আপন করেছিলেন স্ত্রী। ধীরে ধীরে রিকশা চালানো শেখা। এখন রেখা ৫১। প্রৌঢ়ার কথায়, ‘‘স্বামীর সঙ্গে মাঝেমাঝে ওর কাজে চলে যেতাম। তখনই খুঁটিনাটি জেনেছি, কিন্তু রিকশা চালাতে জানতাম না। ও যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন রিকশা চালানো শিখতেই হল।’’ রেখা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসনের তিনি সহায়তা পেয়েছেন। স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রশাসনের কাছে ওই কাজটি নিজে করবেন বলে ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন। আধিকারিকেরা তাঁকে অন্য কাজ দেবেন বলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি রাজি হননি। তিনি জানিয়েছিলেন, স্বামী যে কাজ করে সংসার চালিয়ে এসেছেন, ওই কাজটিই তিনি করবেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েও নিজের ইচ্ছার কথা জানান। পাস হয়ে যায় আর্জি।
কাজ করে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন রেখা। অনেক পরিচর্যার পরেও স্বামীকে আর সুস্থ করতে পারেননি। এখন একা থাকেন বাড়িতে। পুরসভা থেকে প্রতি মাসে যে টাকা পান, তাতে কোনও রকমে চলে যায়। দুর্গাপুজো উপলক্ষে এ বার বোনাস পেয়ে বড্ড খুশি তিনি। প্রৌঢ়ার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এলাকার মানুষের ভালবাসা। তিনি বলেন, ‘‘আমি তো ময়লাকর্মী। কোনও দিন শরীর খারাপ থাকলে কিংবা ভ্যানে সমস্যা হলে বাসিন্দাদের জানিয়ে দিয়ে আসি। তার পরেও ওরা আমার খোঁজ নেয়। শুধু ময়লা ফেলার জন্য নয়, বুঝতে পারি।’’
অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভার স্বচ্ছ ভারত মিশনের দায়িত্বে থাকা আধিকারিক সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘রেখা অত্যন্ত পরিশ্রমী। সকাল থেকে এলাকার নোংরা-ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করে। এলাকার মানুষও তাঁকে খুব ভালবাসেন। এবার পুজোয় আমাদের অন্যান্য কর্মীর মতো তিনিও বোনাস পেয়েছেন। ওঁর দায়িত্ববোধ এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে ভাল সম্পর্কের বিষয়টি ওঁকে আলাদা করে দিয়েছে। ‘নির্মল বন্ধু’ হিসেবে ওঁর সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমরাও খুশি।’’ সিদ্ধার্থের মতে, প্রতিদিন সকালে রেখার এই ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ময়লা সংগ্রহ নিছক রুজিরুটি নয়। সামাজিক এবং সংসারিক নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নারীর লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। যিনি নিজের কষ্টকে আড়াল করে কাজ করে যান। তিনিও তো দুর্গার মতো।
রেখা ওই তুলনা শুনে লজ্জায় জিভ কাটেন। দু’হাত তুলে নমস্কার করে বলেন, ‘‘আমি অতি সামান্য একজন। তবে স্বামীর কাজ গর্বের সঙ্গে করি। এলাকার কেউ মুখ তো ফেরাননি। বরং ভালবেসেছেন। আর কী চাই জীবনে?’’