ছেলের স্বপ্ন ছিল খাকি উর্দি পরবে। পুলিশ হবে। স্কুলে পড়ার সময় ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পস (এনসিসি)-এর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। কলেজে পড়ার সময়ও সেই ইচ্ছা জিইয়ে রেখেছিলেন মনে। কিন্তু সময়ের ফেরে সেই পুলিশের সঙ্গে ‘এনকাউন্টারে’ প্রাণ গেল তাঁর। সেই কথা বলতে বলতে হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকলেন প্রহ্লাদ দাসের মা রেখা দাস। ছেলের এনসিসির পোশাকগুলো বুকে জড়িয়ে মহিলা বললেন, ‘‘কেন এমন করলি...।’’
উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নাবালিকা প্রতিবেশীকে ধর্ষণ এবং খুনে অভিযুক্ত হয়ে প্রহ্লাদ গ্রেফতার হয়েছিলেন রবিবার। সোমবার রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য তাঁকে অকুস্থলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে পুলিশের দাবি। কিন্তু পুলিশের হাত ছাড়িয়ে পালাতে চেয়েছিলেন প্রহ্লাদ। পুলিশের দাবি, এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে তিন রাউন্ড গুলিও করেছিলেন ধৃত। তাদের পাল্টা গুলিতে নিহত হন প্রহ্লাদ।
ছেলের মৃত্যুশোক নিয়ে মা কখনও বলেছেন, যা হয়েছে ভাল হয়েছে। এটাই সমীচীন। কখনও বলেছেন, ছেলে হারানোর কষ্ট তো মায়ের থাকবেই। কিন্তু নাগরিক হিসেবে তিনি খুশি। ছেলে কৃতকর্মের ফল পেয়েছে। কখনও প্রশ্ন তুলেছেন, কী ভাবে এত জন রক্ষী থাকা সত্ত্বেও পালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রহ্লাদ। পুলিশের এনকাউন্টারের বিরোধিতা করেছেন। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পর অন্য এক ‘তথ্য’ দিলেন রেখা।
ছেলের ব্যবহার করা এক-একটি জিনিস হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মহিলা। পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত পুত্রের এনসিসির পোশাক, শংসাপত্র বুকে আগলে বললেন, ‘‘ছোটবেলা বলত পুলিশ হবে...।’’ আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন পুত্রশোকে কাতর রেখা। মায়ের কথায়, ‘‘কলেজে সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছিল। এনসিসি করত। সব সার্টিফিকেট ঘরে গুছিয়ে রেখেছিল। পুলিশে চাকরি করে দেশের আইন রক্ষা করার স্বপ্ন দেখত। আর আজ...।’’ বলতে থাকেন, ‘‘তোর সব জিনিস দেখে দেখে জীবন কেটে যাবে। আর সহ্য করতে পারছি না।’’
আরও পড়ুন:
প্রহ্লাদের মায়ের বক্তব্য, ছেলে অন্যায় করে থাকলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। যদি অপরাধ করে থাকে, তার প্রমাণ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে সব কিচ্ছু হল না। রেখা বলেন, ‘‘কোমরে বাঁধা আগ্নেয়াস্ত্র, এত পুলিশকর্মী। তার পরেও ভাবে ছিনিয়ে নিল ছেলে!’’ পুলিশের বক্তব্য নিয়ে তাঁর মনে সংশয় তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, ছেলের মৃত্যুর পর চুপচাপ হয়ে গিয়েছেন রামপ্রসাদ। সংসার টানতে বাবা-ছেলে দুটো সেলুনের দোকান খুলেছিলেন। এক রোজগেরে সদস্য কমল। ছেলের জন্য সমাজের চোখে সকলে ‘খারাপ’ হলেন বলে মনে করেন রামপ্রসাদ। ছেলের পরলৌকিক ক্রিয়াকর্মে ব্যস্ত প্রৌঢ় বলেন, ‘‘আমার আর কিচ্ছু বলার নেই।’’