বিদেশি বলে কাউকে সন্দেহ করা হলে তাঁকেই নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণ করার কোনও দায় রাষ্ট্রের নেই। এই সংক্রান্ত একটি মামলায় রায় ঘোষণা করে এমনটাই জানিয়ে দিল কলকাতা হাই কোর্ট। ২০২৫ সালের অভিবাসন এবং বিদেশি আইন উল্লেখ করে আদালত জানিয়েছে, সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। আদালত বা রাষ্ট্রের সেখানে কিছু করার নেই। আবেদনকারীর ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, আধার কার্ড এমনকি, জমি সংক্রান্ত নথিপত্রও খারিজ করে দিয়েছে আদালত।
বাংলাদেশি সন্দেহে বেআইনি ভাবে আটকের অভিযোগ তুলে হাই কোর্টে হেবিয়াস কর্পাস মামলা করেছেন সুমন মোল্লা নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগ, গত ১৮ জুন তাঁর ভাইপোকে বেআইনি ভাবে তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। রাখা হয়েছে ডিটেনশন শিবিরে। ভাইপো ভারতীয়, প্রমাণ করতে মামলাকারী তাঁর ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ব্যাঙ্কের পাসবই এবং দাদুর আমলের জমির নথি আদালতে দেখিয়েছেন। পারিবারিক অন্যান্য নথিও জমা দেওয়া হয়েছে। দেখানো হয়েছে বাবার সম্পর্কের এক আত্মীয়ের পাসপোর্ট। কিন্তু কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই সমস্ত নথির কোনওটিতেই তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয় না।
আরও পড়ুন:
আদালত জানিয়েছে, ভোটার কার্ড শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম থাকার প্রমাণ। আধার কার্ড এবং প্যান কার্ডও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তা ছাড়া, এ ক্ষেত্রে মামলাকারীর আবেদনে বেশ কিছু জায়গায় খটকা রয়েছে। আদালতে তার সদুত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, মামলাকারীর ভাইপো বাংলাদেশি নাগরিক। পুলিশ আটক করার পর তিনি নিজেই সে কথা স্বীকার করেছিলেন। তার ভিডিয়ো রেকর্ডিং রয়েছে। আইন অনুযায়ী তাঁকে ডিটেনশন শিবিরে রাখা হয়েছে এবং ৬০ দিনের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হয়েছে। এখনও গ্রহণযোগ্য কোনও নথি তিনি দেখাতে পারেননি।
সুমনের আইনজীবীর সওয়াল, এর আগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় তাঁর ভাইপোর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদনও করেছেন। এখনও সেখানে মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। তার মধ্যেই পুলিশ তাঁকে আটক করেছে। মামলাকারীর আইনজীবী দাদুর আমলের জমির রেকর্ড, ভোটার-আধার সংক্রান্ত তথ্যের উল্লেখ করে জানান, তাঁর মক্কেল ভারতীয়। না হলে এত নথি কোনও এক জনের পক্ষে জাল করা সম্ভব নয়।
কিন্তু উভয়পক্ষের সওয়ালের পর রাজ্যের সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছে হাই কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ওই ব্যক্তি দিতে পারেননি। যে সমস্ত নথি দেখিয়েছেন, তাতে বাবার নামে গরমিল রয়েছে। তা ছাড়া, আটক ব্যক্তির বাবা-মায়ের মৃত্যু কোথায় হয়েছে, কোথায় তাঁদের শেষকৃত্য হয়েছে, বার বার জিজ্ঞাসা করার পরেও সে বিষয়ে তিনি কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। মামলাকারী ওই ব্যক্তিকে নিজের ভাইপো বলে দাবি করছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আটক ব্যক্তির বয়স মামলাকারীর চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। তাতেও সন্দেহ জোরালো হয়েছে বলে মত আদালতের। সব দিক বিবেচনা করে তাই আদালত জানিয়েছে, কোনও ব্যক্তি দেশের নাগরিক কি না সেটা তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় আদালতের কিছু করার থাকে না।