বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর সময় ঘটে চলা অশান্তি থেকে নজর ঘোরাতেই বামেদের বুকস্টল ভাঙা নিয়ে ‘অহেতুক’ চেঁচামেচি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এ বিষয়ে নীরব থাকার জন্য বিঁধলেন ও পার বাংলার অভিনেতা জয়া আহসান, এমনকি এ পার বাংলার প্রসেনজিৎকেও। ‘‘এঁদের মুখে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কোনও সমালোচনা শুনছি না,’’ মন্তব্য শমীকের।
পুজোয় বামেদের বুকস্টল করা নিয়ে বিতর্ক প্রথম উস্কে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু আধিকারী। ব্যানারে ‘দুর্গাপুজো’ না লিখে ‘শারদোৎসব’ লিখলে স্টল করতে না-দেওয়ার ‘পরামর্শ’ দিয়েছিলেন পুজো কমিটিগুলিকে। তার পর জল আরও অনেকটাই ঘোলা হয়েছে। কলকাতাতেই অন্তত দশটি জায়গায় স্টল ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছে সিপিএম। এক বার পুলিশকে জানানো সত্ত্বেও শুক্রবার এন্টালির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে বইয়ের স্টল বিজেপি ভেঙে দিয়েছে বলে অভিযোগ সিপিএমের। মারধর করা হয়েছে দলের নেতা-কর্মীদের। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী দেবেশ দাশ আহত হয়েছেন বলে খবর। সিপিএমের পাশাপাশি এসইউসি-সহ অন্যান্য বামপন্থী দলের বইয়ের স্টল ভাঙারও অভিযোগ উঠেছে। এই আবহে নতুন মাত্রা জুড়লেন শমীক। তাঁর প্রশ্ন, বাংলাদেশে পুজোর সময় সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে চিন্তিত হওয়া বেশি জরুরি, নাকি বামেদের বুকস্টল নিয়ে? যা শুনে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর জবাব, ‘‘বাংলাদেশে হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ আমি অন্যায় বলে মনে করি। যে কোনও জায়গায় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ অন্যায়। সমান অপরাধ।’’
দুর্গাপুজোর মরশুমে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে বলে সম্প্রতি অভিযোগ করেছে সে দেশের পূজা উদ্যাপন পরিষদ। বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা দাবি করেন, সিলেট, রাজবাড়ি, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল-সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও আক্রমণের ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। ১১টি মামলায় এ পর্যন্ত কয়েক জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি আনন্দবাজার ডট কমকে এ দিন বলেন, ‘‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে লাগাতার অত্যাচার চলছে। অথচ জয়া আহসান-সহ আরও অনেকে, যাঁরা এ দেশে এসে কাজ করছেন, রোজগার করছেন, তাঁরা সে সব নিয়ে এক বারের জন্যও মুখ খুলছেন না।’’ শমীকের ক্ষোভ এ রাজ্যের ‘খ্যাতনামাদের’ নিয়েও। ‘‘প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এত বড় নাম। তিনি বা তাঁর মতো অনেকে এই বাংলাদেশি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে উঠছেন-বসছেন, নানা অনুষ্ঠানে একসঙ্গে হাজির হচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশে উৎসবের মরসুমে সংখ্যালঘুর উপর লাগাতার আক্রমণ নিয়ে তাঁদের কোনও উদ্বেগ রয়েছে বলে মনেই হচ্ছে না।’’
মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি যতটা সঙ্কটজনক ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে কিছুটা হলেও উন্নতি ঘটেছে বলে পর্যবেক্ষক মহলের একাংশের অভিমত। দিন কয়েক আগে হিন্দু নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘‘ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান হিসেবে আমার দায়িত্ব। প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমার সাধ্যের মধ্যে যা করা সম্ভব, সেই চেষ্টা আমি করব।’’ দুর্গাপুজো উপলক্ষে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে সরকারি তহবিল থেকে যে টাকা দেওয়া হয়, এ বছর তার পরিমাণ এক কোটি টাকা বাড়িয়ে পাঁচ কোটি করেছে বাংলাদেশ সরকার। ছুটিও বাড়ানো হয়েছে এক দিন। রাজধানী ঢাকাতে পুজোর সংখ্যা তিনটি কমলেও গোটা দেশে পুজোর সংখ্যা দেড় হাজার বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি অবশ্য মনে করছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক এবং সে দিক থেকে নজর ঘোরাতেই এক দল লোক বামদের বই বিপণি ভাঙা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। বিজেপি বিরোধী প্রচারে শান দিচ্ছেন সিপিএম এবং অন্য বামদলগুলির নেতারা। তাঁদের সমর্থনে পাশে দাঁড়িয়েছেন রাজ্যের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের পরিচিত বামপন্থী মুখ। এই জগতের অন্যরা, যাঁরা বামপন্থী বলে পরিচিত নন, এখনও প্রকাশ্যে বিজেপির পাশে নেই। ফলে বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের সাম্প্রতিক এই বিতর্কে বিজেপি-কে একটু একঘরেই দেখাচ্ছে।
বামেদের বুকস্টল ভাঙার পিছনে বিজেপির কোনও ভূমিকা রয়েছে, মানতেই নারাজ শমীক। ‘‘এগুলো সিপিএমের-ই পুরনো পাপ।’’ বলছেন তিনি। তাঁর দাবি, সিপিএমের তৈরি করা গুন্ডারা তৃণমূলের জমানায় তৃণমূল হয়ে গিয়েছিল। এখন বড় হিন্দুত্ববাদী সাজতে চাইছে। ‘‘তারাই গিয়ে সিপিএমের উপরে চড়াও হচ্ছে। নিজের পাপেরই শিকার হচ্ছে সিপিএম।’’ কটাক্ষ শমীকের। তবে তাঁর অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই বলেই দাবি সুজন চক্রবর্তীর। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা বুকস্টল ভাঙতে আসছেন, তাঁরা জয় শ্রীরাম-সহ শমীকবাবুদের যা যা পছন্দ তাই বলছেন। দেখে নেব, দেখে নেব ভাব। বাম বধ, বাম বধ ভাব। তাঁরা যে ভাবে চোখ রাঙাচ্ছেন, সেটা মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতাদের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তাই অসহায়ের মতো শমীক ভট্টাচার্য যা বলছেন, বাস্তবের সঙ্গে তার মিল থাকছে না।’’