Advertisement
E-Paper

এত রক্ষী, তা-ও পালাতে গেল? জিজ্ঞাসা প্রহ্লাদের মায়ের, খুনি পুলিশই! বললেন সামিউলের স্ত্রী, দুই পরিবারের প্রশ্নে ‘এনকাউন্টার’

সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যে দুটো পুলিশি ‘এনকাউন্টার’। অভিযোগ ধৃতেরা পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালাতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর এক দিন পর দুই পরিবারের নানা প্রশ্ন।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ২১:৩৭

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

এত পুলিশ থাকতে কী ভাবে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরই গুলি করতে পারে বন্দি? ‘এনকাউন্টারে’ নিহত দুই অভিযুক্তের পরিবারেরই এক প্রশ্ন। গাইঘাটার প্রহ্লাদ দাসের মা চান ‘আসল সত্য’ সামনে আসুক। সামশেরগঞ্জের সামিউল শেখের স্ত্রী অভিযোগ করলেন, ছক কষে তাঁর স্বামীকে স্রেফ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘এনকাউন্টারের’ এক দিন পর দুই পরিবারেরই এক কথা, কেন আদালতে বিচারপর্বের সুযোগ মিলল না!

‘এনকাউন্টার’ গাইঘাটা

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নাবালিকা প্রতিবেশীকে ধর্ষণ এবং খুনে অভিযুক্ত হয়ে প্রহ্লাদ গ্রেফতার হয়েছিলেন রবিবার। সোমবার রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য তাঁকে অকুস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি। কিন্তু পুলিশের হাত ছাড়িয়ে পালাতে চেয়েছিলেন প্রহ্লাদ। পুলিশের দাবি, এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে তিন রাউন্ড গুলিও করেছিলেন ধৃত। তাদের পাল্টা গুলিতে নিহত হন প্রহ্লাদ।

ছেলের মৃত্যুশোক নিয়ে মা কখনও বলেছেন, যা হয়েছে ভাল হয়েছে। এটাই সমীচীন। কখনও বলেছেন, ছেলে হারানোর কষ্ট তো মায়ের থাকবেই। কিন্তু নাগরিক হিসেবে তিনি খুশি। ছেলে কৃতকর্মের ফল পেয়েছে। কখনও প্রশ্ন তুলেছেন, কী ভাবে এত জন রক্ষী থাকা সত্ত্বেও পালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রহ্লাদ। পুলিশের এনকাউন্টারের বিরোধিতা করেছেন। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পর অন্য এক ‘তথ্য’ দিলেন রেখা। ছেলের ব্যবহার করা এক-একটি জিনিস হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মহিলা। পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত পুত্রের এনসিসির পোশাক, শংসাপত্র বুকে আগলে বললেন, ‘‘ছোটবেলা বলত পুলিশ হবে...।’’ আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন পুত্রশোকে কাতর রেখা। মায়ের কথায়, ‘‘কলেজে সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছিল। এনসিসি করত। সব সার্টিফিকেট ঘরে গুছিয়ে রেখেছিল। পুলিশে চাকরি করে দেশের আইন রক্ষা করার স্বপ্ন দেখত। আর আজ...।’’ বলতে থাকেন, ‘‘তোর সব জিনিস দেখে দেখে জীবন কেটে যাবে। আর সহ্য করতে পারছি না।’’

আরও একটি কথা বলেছেন রেখা। তাঁর দাবি, ছেলেকে কখনও নেশা করতে দেখেননি বা কারও মুখে শোনেননি যে, ছেলে নেশা করে। কিন্তু সেই ‘অভিশপ্ত রাতে’ মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছিল সে। ছেলে নিজেই বলেছিল সে কথা। মহিলার কথায়, ‘‘ঘটনার দিন ছেলে মদ্যপান করেছিল। থানায় ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলাম। তখন বলেছিল, ও কী করে ফেলেছে, নিজেই বুঝতে পারছে না।’’ মহিলার কথায়, ‘‘অন্যায় তো অন্যায়। চাইব, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না আর ঘটে। কোনও মেয়ের সঙ্গে এমন কিছু না হোক। কোনও ছেলে যেন মাকে এ ভাবে দুঃখ না দেয়। কিন্তু দোষের বিচার যেন আদালতে হয়। যেন প্রমাণ হয় কে দোষী। তার আগে চলে গেলে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।’’ তিনি জানান, ছেলের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন না। চান, সত্য সামনে আসুক।

‘এনকাউন্টার’ সামশেরগঞ্জ

সোমবারই ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বহরমপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন রাজেদা বিবি। সেই সময় স্বামী সামিউল তাঁকে নাকি আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং ঠিক এটা প্রমাণ করেই বাড়়ি ফিরবেন। কিন্তু তার ঘণ্টা কয়েক পর রাজেদা শুনলেন, স্বামী আর নেই!

বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল ২৭ অগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাঁর খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন সামিউল। তা ছাড়া তাঁর এক বান্ধবী তাজকিরা বিবি এবং তাজকিরার ছোট জামাই জনি শেখকে ধরে পুলিশ। অভিযোগ, সামশেরগঞ্জের ডাকবাংলো এলাকার ভুটু মার্কেট থেকে সামান্য দূরে সামাউলের ভাড়াবাড়িতেই খুন করা হয়েছিল সুজিতকে। অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য মঙ্গলবার বিকেলে সামিউলকে সেই ভাড়াবাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। পুলিশের দাবি, সেই সময় আচমকাই এক পুলিশকর্তার পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করেন অভিযুক্ত। আত্মরক্ষার্থে এবং ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। পুলিশের ছোড়া গুলিতেই অকুস্থলে মারা যান সামিউল।

সামিউলের এক আত্মীয়ের অভিযোগ, ঘটনায় সিআইডি তদন্ত করছিল। পুনর্নির্মাণে উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা ছিলেন। তাঁদের সামনে কী ভাবে এক জন বন্দি বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন! পরিবারের দাবি, গল্প সাজিয়ে সামিউলকে খুন করা হয়েছে। স্বামীর গ্রেফতারির পর থেকেই খুনের সঙ্গে তাঁর যোগ অস্বীকার করে এসেছেন স্ত্রী রাজেদা। মঙ্গলবার বিকেলে এনকাউন্টারের খবর পাওয়ার পর থেকে স্বামীর খোঁজে এক বার যান স্থানীয় হাসপাতাল। সেখান থেকে থানা। কোথাও কোনও খবর পাননি বলে দাবি তাঁর। বুধবার সকালে পুলিশের তরফে জানতে পারেন, জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালের পুলিশ মর্গে রাখা রয়েছে সামিউলের দেহ। সেখান থেকে ময়নাতদন্তের জন্য দেহ বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এক দিকে স্বামী হারানোর গভীর শোক, অন্য দিকে পুলিশের দাবি ঘিরে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা—সব মিলিয়ে অথৈ জলে পড়েছে সামিউলের পরিবার। রাজেদা বলেন, ‘‘ওকে খুনের পরিকল্পনা করেই রিমান্ডে আনা হয়েছিল। পুলিশ তদন্ত শেষ না করে নিজেই বিচারকের ভূমিকা নিয়ে কী ভাবে একটা মানুষের জীবনের ইতি টেনে দিল? পুলিশ বিচার না করে কী ভাবে শাস্তি দিল?’’ তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করেছেন। রাজেদা বলেন, ‘‘স্বামী আমাকে বলেছিল, পুলিশ রিমান্ডে নেবে। এর আগে চার বার তদন্ত করেছে। সেখানে আমার কোনও দোষ পায়নি। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে গিয়ে আমাকে প্রচুর মারধর করবে। আমার খুব ভয় লাগছে।’’ ‘এনকাউন্টারে’ নিহতের বৌদি মোসাম্মৎ মির্জা খাতুনের প্রশ্ন, ‘‘পায়ে গুলি না করে সরাসরি বুকে কেন গুলি চালানো হল? আইনি প্রক্রিয়ার বিচার না করে কেন এনকাউন্টার করা হল?’’ তাঁরা ফের তদন্তের দাবি তুলেছেন।

Police Encounter Gaighata Samserganj Police case Murder Rape and Murder

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy