Advertisement
E-Paper

‘পচা’ খাদ্যের রমরমা! দু’দিনেই ১,৫২৫ জায়গায় অনিয়ম ধরা পড়ল, বন্ধের নির্দেশ নামজাদা বহু বিপণি, কলকাতায় কারা?

শারদ্বত জানিয়েছেন, খাদ্যসুরক্ষা অভিযানের প্রথম দিনে মোট ৯০৬টি এবং দ্বিতীয় দিনে ৮২৪টি ফুড সেন্টারে অভিযান চলেছে। ১১টি দোকানে বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। লাইসেন্স বাতিল হয়েছে পাঁচটির।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৩৩
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। —নিজস্ব চিত্র।

রাজ্যের বিভিন্ন রেস্তরাঁ, হোটেল এবং অন্যান্য খাবারের দোকানে খাদ্যসুরক্ষা দফতরের অভিযান চলছে। দু’দিনের মধ্যেই মোট ১,৭৩০টি ফুড সেন্টার স্বাস্থ্য ভবনের আতশকাচের নীচে চলে এসেছে। বড়সড় অনিয়ম ধরা পড়েছে অন্তত ১,৫২৫টি-তে, জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।

রাজ্যে খাবারের দোকানগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। তার মধ্যেও শীর্ষে ডায়মন্ড হারবার। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় অনিয়ম ধরা পড়েছে। রেস্তরাঁ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, পানীয় জলের দোকানগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে সরকার। জনগণ এবং দোকানের মালিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

শারদ্বত জানিয়েছেন, খাদ্যসুরক্ষা অভিযানের প্রথম দিনে মোট ৯০৬টি এবং দ্বিতীয় দিনে ৮২৪টি ফুড সেন্টারে হানা দিয়েছেন আধিকারিকেরা। ১,৫১৭টি জায়গায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে এবং সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১১টি দোকানে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হয়েছে পাঁচটি দোকানের। এ ছাড়া, মোট ১৩টি দোকান সিল করে দিয়েছে সরকার। আরও ১৭টির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করার প্রক্রিয়া চলছে। দু’দিনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৯০১টি নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য দফতর।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জেনে হোক বা অজান্তে, খাবারের মধ্যে বিষ মেশানো চলছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মোট ২১৫টি দোকানে অনিয়ম ধরা পড়েছে। তার মধ্যে শুধু ডায়মন্ড হারবারেই রয়েছে ১৫৩টি দোকান। এ ছাড়া, উত্তর ২৪ পরগনায় ১২৮টি, পূর্ব বর্ধমানে ১২৯টি, কলকাতায় ৯৬টি, কোচবিহারে ৮৩টি, বসিরহাটে ৭৭টি, পশ্চিম বর্ধমানে ৬৫টি, নদিয়ায় ৬০টি এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫১টি দোকান চিহ্নিত করা হয়েছে। কোন কোন দোকানের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, কেন করা হয়েছে, তার একটি তালিকাও দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

শারদ্বত জানান, মালদহের জ়াইকা রেস্তরাঁ, শ্রীকৃষ্ণ সুইট শপকে খাবারের মান নিয়ে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল। তা না-শোনায় দোকানগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের স্টার মলে ‘রং দে বসন্তী’র লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে। আপাতত দোকান বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ, সেখানে মুরগির বাসি মাংস, মাছ বিক্রি করা হচ্ছিল। রান্নায় ব্যবহার করা হচ্ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ সামগ্রী। ওই রেস্তরাঁয় লাল লঙ্কার গুঁড়োয় ছত্রাক পাওয়া গিয়েছে বলেও অভিযোগ। কলকাতার সল্টলেকে আরডিবি মলের ‘অ্যাবসলিউট বারবিকিউ নেশন’-এও অস্বাস্থ্যকর খাবার রয়েছে বলে অভিযোগ। সেখানে বাসি খাবার মজুত করা এবং রান্নাঘরে পোকামাকড়ের প্রমাণ মিলেছে। সেক্টর ফাইভের নবদিগন্তের কাঠি রোলের বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। অভিযোগ, ওই দোকানের ফ্রিজ অপরিষ্কার ছিল। নষ্ট হয়ে যাওয়া মাংস, মাছ এবং কাঁচা রান্না ফ্রিজে রাখা ছিল।

মালদহের রতুয়ায় মা মনসা ওয়াটার প্ল্যান্টের বিক্রেতা খাদ্যসুরক্ষার বৈধ লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। নিয়ম না মেনে ব্যবসা চালানোর অভিযোগে সেখানে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই পদক্ষেপ করা হয়েছে রতুয়ার প্যাকেজ়ড ড্রিঙ্কিং ওয়াটার, ঋত্বিকা ওয়াটার, অ্যাকোয়াতারা ওয়াটার সার্ভিস, আতিকা অ্যাকোয়া বুন্দের মতো সংস্থায়। মালদহের নিউ রাজেশ ভুজিয়া সেন্টারে গিয়ে আধিকারিকেরা দেখেছেন, সেখানকার খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের স্থান নিম্নমানের। মেঝে অপরিচ্ছন্ন। এমনকি, প্যাকেটে খাবার তৈরির তারিখও উল্লেখ করা হয়নি। পরিদর্শনের সময় প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি কর্তৃপক্ষ।

মালদহের ইংরেজবাজারের ‘কলকাতা আর্সালান বিরিয়ানি’তেও ধরা পড়েছে অনিয়ম। অস্বাস্থ্যকর মাংস ব্যবহার করায় সেখানে বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুরে ‘বারবিকিউ নেশনে’ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নার অভিযোগ রয়েছে। বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে সেখানেও। এ ছাড়া, মেটানিল ইয়েলো মজুত এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভিযোগে সল্টলেকের চৌরাসিয়া চাট্‌সের লাইসেন্স সাসপেন্ড করেছে স্বাস্থ্য ভবন। বহরমপুরের বিশ্বাস বেকারি, পানিহাটির চাকাওয়ালা এবং শীতল সুইটস অ্যান্ড স্ন্যাক্সের বিরুদ্ধেও একই পদক্ষেপ করা হয়েছে। বিশ্বাস বেকারির বিরুদ্ধে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারের রং এবং প্যাকেজিংয়ে খবরের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

ফুড সেফটি অফিসার সুমন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, মেটানিল ইয়েলো ঘরের জানলা বা গ্রিল রং করার কাজে ব্যবহৃত হয়। সেগুলি রান্নার হলুদে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে, জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা ও নিয়ামক সংস্থা (এফএসএসএআই)-র নতুন নিয়মের কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্যে ৩০টি মোবাইল ফুড ল্যাব রয়েছে। কলকাতায় অত্যাধুনিক ল্যাব রয়েছে দু’টি। দোকানের খাবার সম্পর্কে জনগণ এবং দোকানের মালিকদের সচেতন করাই স্বাস্থ্য ভবনের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।

হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কার গুঁড়ো নিয়ে বিশেষ ভাবে সতর্ক করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের বক্তব্য, নিরাপদ নয় জিলিপিও। সুমন বলেছেন, ‘‘সস যে খাচ্ছেন, তার সব ক’টি স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। রাজ্যবাসীকে বলব, কী জিনিস খাচ্ছেন একটু বুঝে খাবেন। হলুদে মেটানিল ইয়েলো ব্যবহার করা হচ্ছে। গুঁড়ো হলুদে এগুলো বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এফএসএসএআই-এর সিলমোহর দেওয়া প্যাকেটে এগুলো থাকছে না। আমরা সারা রাজ্যেই মেটানিল ইয়েলো ব্যবহার বন্ধের চেষ্টা করছি। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, স্বাস্থ্য দফতর সক্রিয়। রঙিন খাবার থেকে সতর্ক থাকুন। জিলিপিতেও মেটানিল ইয়েলো ব্যবহার হচ্ছে। লঙ্কা গুঁড়োর সঙ্গেও এক ধরনের রং ব্যবহার করা হচ্ছে যা ক্ষতিকর।’’

ব্লাড ব্যাঙ্কের প্রসঙ্গে শারদ্বত জানান, রাজ্যের ৭৩টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের মধ্যে দু’টি বাদে বাকি ৭১টিকে রক্তগ্রহণের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে হেল্‌থ পয়েন্ট এবং লাইফকেয়ার নামের দু’টি ব্যাঙ্ককে। কারণ, ওই দুই ব্লাড ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ রাজ্য রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাই কোর্টে গিয়েছেন। আদালতে শুক্রবার একটি শ্বেতপত্র দেওয়ার কথা রয়েছে, জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ ছাড়া, কোনও মেডিক্যাল কলেজ থেকে পড়ুয়ারা যাতে রক্তদান শিবিরে না-যান, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষকে তা নিয়ে সতর্কও করে দেওয়া হয়েছে। এর পরেও কোনও পড়ুয়া রক্তদান শিবিরে ধরা পড়লে তাঁকে প্রথমে সতর্ক করা হবে এবং পরে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। ব্লাড ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত উন্নত মানের মোবাইল অ্যাপ তৈরি করছে সরকার। রক্তদানের নিয়মাবলি, রক্তগ্রহণের নিয়মাবলি সেখানে বিশদে থাকবে। এ ছাড়া, মিড-ডে মিল এবং হাসপাতালে রোগীদের খাবারের মানও পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানান শারদ্বত।

বৃহস্পতিবারও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্যসুরক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা অভিযান চালিয়েছেন। হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার আরও হোটেল এবং রেস্তরাঁয় অনিয়ম ধরা পড়েছে। চুঁচুড়া পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর তথা তৃণমূল নেত্রী মৌসুমি সাহার মালিকানাধীন রেস্তরাঁ থেকে উদ্ধার হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঠান্ডা পানীয়, চিজ়, শিশুদের খাবার এবং বাসি, পচা মাংস। স্বাস্থ্যবিধি মেনে রেস্তরাঁ পরিচ্ছন্ন করার জন্য ১৫ দিন সময় তাঁদের দেওয়া হয়েছে।

উত্তরপাড়ার মিষ্টির দোকানেও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রয়েছে। দইয়ে ভর্তি পাত্রে পাওয়া গিয়েছে মরা মাছি এবং আরশোলা। অনেক মিষ্টি দই ফেলে দেওয়া হয়েছে। মগরা স্টেশন রোডের একটি বেকারিতে ২৪০ বস্তা চিনি মজুত করা ছিল। ছিল ১৭৪ বস্তা ময়দা, ৬০ টিন তেলও। তিন দিনের মধ্যে তার হিসেব চেয়েছেন আধিকারিকেরা। হানা দেওয়া হয়েছে বিরিয়ানির দোকানগুলিতেও। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালিতে হোটেল ও রেস্তরাঁয় হানা দিয়ে বাসি খাবার, ভেজাল সামগ্রী উদ্ধার করেছে স্বাস্থ্য ভবন।

Food Safety Sharadwat Mukherjee

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy