সকাল থেকে রাত, বুধবার দিন যত গড়িয়েছে, বীরভূমের মিনার মণ্ডলের বাড়ির আনাচকানাচ থেকে বেরিয়েছে থরে থরে নোট। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত, উত্তরবঙ্গ রাজ্য পরিবহণ নিগমের বাসচালকের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়া মিনারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে ২৮.৫ কোটি টাকা এবং ১৫ কিলোগ্রাম সোনার বাট। পুলিশ সূত্রে খবর, টাকা গোনা চলছে এখনও।
বীরভূমের মহম্মদবাজারে বাসিন্দা মিনারের অন্য এক পরিচয় রয়েছে। তিনি জেলার ‘পাথরসম্রাট’ নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের ভগ্নিপতি ( টুলুর পিসতুতো বোনের স্বামী)। একই সঙ্গে টুলুর টোল ব্যবসার ম্যানেজার। বুধবার ভোর থেকে তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। তবে এলাকার মানুষ হোক বা পুলিশ, উদ্ধার হওয়া বিপুল টাকা যে মিনারের নয়, সে ব্যাপারে সকলেই এক মত। তা হলে টাকা কার? রাতে বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদীত রাজ বুন্দেশ জানান, ওই টাকা টুলুরই। এ দিন দিনভর টুলুর খোঁজ পায়নি পুলিশ। আমরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। কিন্তু উদ্ধার হওয়া এই বিপুল টাকার সঙ্গে কেন জড়িয়ে গেল টুলুর নাম? এই কোটি কোটি টাকা, কেজি কেজি সোনার উৎসই বা কী? খোঁজার চেষ্টা করল আনন্দবাজার ডট কম।
কে এই টুলু?
বীরভূম জেলায় টুলুর পরিচয়— ‘পাথরসম্রাট’। পিছনে অনেকেই বলেন, ‘পাথর মাফিয়া’। কারণ, মহম্মদবাজার থেকে শুরু করে মুরারই, নলহাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ব্যাসল্ট পাথরের খনি থেকে গোটা রাজ্যে, ভিন্রাজ্য বা বাংলাদেশেও যে পাথর (নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত কালো স্টোনচিপ) সরবরাহ হয়, গোটাটাই নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন টুলু।
খনি থেকে পাথর প্রথমে আসে ক্রাশারে, যেখানে বড় বড় পাথরের টুকরো বিভিন্ন মাপে ভাঙা হয়। ক্রাশার থেকে লরি ভর্তি হয়ে সেই পাথর যায় বিভিন্ন জায়গায়। আর ক্রাশার থেকে লরি বেরোনোর চাবিকাঠি (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট বা ডিসিআর)-এর মালিক টুলু। সোজা কথায় টুলুকে এড়িয়ে একটা লরিও ক্রাশার থেকে পাথর নিয়ে যেতে পারে না।
ব্যাসল্ট পাথরের খনির সুবাদে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া সোঁৎশাল গ্রামের রাস্তায় শয়ে শয়ে লরির ভিড়। এলাকার চাষি পরিবারের ছেলেরাও ভিড় জমাচ্ছে ক্রাশারে, পাথর খনিতে— রোজগারের আশায়। পাঁচামি স্টোন কোয়ারি সংগঠনের এক প্রবীণ সদস্যের কথায়, ‘‘ওই যুবকদের ভিড়ে ছিল টুলুও। সময়টা ২০০০ সাল। প্রথম দিকে দিনমজুর হিসেবে ক্রাশারে আসা লরিতে পাথর বোঝাই করত টুলু।’’ তবে বেশি দিন সেই কাজ করেননি। লরিচালকদের সঙ্গে চুক্তি করে লরিতে পাথর বোঝাই করার বরাত নেওয়া শুরু করেন। মূলধন ছাড়া ব্যবসা। সেই মুনাফার টাকাতেই ২০১০ সালের মধ্যে কিনে ফেলেন পুরনো একটা লরি। সেই লরিতে শুরু হয় পাথর সরবরাহ। বছর কয়েকের মধ্যে আরও দুটো পুরনো লরি কিনে টুলু হয়ে ওঠেন ছোটখাটো পাথর ব্যবসায়ী।
পাঁচামি স্টোন কোয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের আরও এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘টুলুর ভাগ্য বদলে গেল ২০১৬ সালের পর থেকে। যখন থেকে পাথর খাদানে ডিসিআর কাটার নিয়ম চালু হল।’’
শুল্ক ব্যবস্থায় পরিবর্তন
বাম আমলে স্টোন কোয়ারি বা পাথর খনি যিনি লিজ নিয়েছেন তাঁর কাছ থেকেই রাজ্য সরাসরি শুল্ক আদায় করত। শুল্ক সংগ্রহ করত ভূমি রাজস্ব দফতর। ক্রাশার থেকে পাথর বোঝাই লরি নিয়ে যাওয়ার সময় আর এক দফা বাণিজ্যিক কর আদায় করত স্থানীয় ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত। তাদের দেওয়া চালান সমস্ত লরিতে থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।
তৃণমূল আমলে এর সঙ্গে যুক্ত হল টন-পিছু বা কিউবিক মিটার-পিছু আরও একটি শুল্ক। ভূমিরাজস্ব দফতর সেই কর আদায় করত। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে টোল গেট দেখভালের দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেয় তৃণমূল। উদ্দেশ্য, কোনও লরি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে কি না, সে দিকে নজরদারি করা। বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, এই পরিকল্পনার পিছনে ছিলেন রাজ্যের এক আমলা, যিনি একসময় বীরভূমের জেলাশাসক হিসেবে কাজ করেছেন। কোন সংস্থা টোল গেট পরিচালনার দায়িত্ব পাবে তা ঠিক করতে টেন্ডার ডাকা হয়। কিন্তু সর্ষের ভিতরে ভূত ঢুকতে দেরি হয়নি।
ডিসিআর দুর্নীতি কী ভাবে শুরু হল?
আপাত ভাবে নয়া শুল্ক নীতিতে দুর্নীতির আভাস পাওয়া কঠিন। রাজ্যের কোষাগার ভরানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, টেন্ডার প্রক্রিয়াতেই স্বচ্ছতার অভাব। বীরভূমে সেই সময় অনুব্রত মণ্ডলই শেষ কথা। সোঁৎশালের পাথর ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই টোল গেট পরিচালনার দায়িত্ব পান টুলু। শুরুতে বাড়ির এলাকা সোঁৎশালের টোলগেটের। পরে ওই এলাকার আরও ছ’টি টোলগেটের। সেখান থেকেই তাঁর ফুলেফেঁপে ওঠা। কী ভাবে?
দুর্নীতির অ-আ-ক-খ
অভিযোগ, শাসক নেতাদের সক্রিয় মদতে তৈরি হতে থাকে জাল ডিসিআর। অর্থাৎ লরি থেকে নিয়মমতো শুল্ক নিয়ে যে ডিসিআর চালকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো, সেটা নকল। এই জালিয়াতির পিছনে ভূমিরাজস্ব দফতরের কর্মীদেরও ভূমিকা রয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। দু’পক্ষের যোগসাজশে কার্যত লুট হতে থাকে কোটি কোটি টাকা। এক পাথর ব্যবসায়ী জানাচ্ছেন, যখন এই টোল চালু হয়, তখন টন প্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়া হত। বাড়তে বাড়তে যা এখন টন প্রতি ২৫০ টাকা।
ক্রাশার থেকে মূলত ১৬ বা ১৮ চাকার লরি পাথর পরিবহণ করে। প্রথম ধরনের লরির নিয়মমাফিক (ওভার লোডিং না করলে) বহনক্ষমতা ৩২ টন, দ্বিতীয় ধরনের লরির ৪০ টন। অর্থাৎ লরি প্রতি শুল্ক ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। দিনে গড়ে ৩ হাজার লরি পাথর পরিবহণ করে ওই এলাকায়। অর্থাৎ সরকারের কোষাগারে প্রতিদিন অন্তত আড়াই কোটি টাকা শুল্ক জমা পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার ১০ শতাংশও জমা পড়ত না। ডিসিআর নকল করে বাকি টাকা চলে যেত টুলুর কাছে। সেখান থেকে অন্যত্র। তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা ওই টাকার ভাগ পেতেন বলে বিজেপির অভিযোগ। ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বিজেপি নেতারা এ নিয়ে সরব।
প্রকাশ্যে এল চমকে দেওয়া রাজস্বের হিসাব
ক্ষমতায় আসার পরেই, বেসরকারি হাতে টোল গেট নিয়ন্ত্রণ হওয়া বন্ধ করে দেয় বিজেপি। ভূমিরাজস্ব, পরিবহণ দফতর-সহ সরকারের চারটি দফতরের আধিকারিকদের সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৭ মে থেকে চালু হয়েছে নতুন পদ্ধতি।
সরকারি নথি বলছে, বিগত সরকারের আমলে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৯ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে ডিসিআর থেকে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন রাজস্বের পরিমাণ গড়ে ৭০ লাখ। আর নতুন সরকারের আমলে ১৭ মে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। পরের দিন আদায়ের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৩০ লক্ষ। সিউড়ির বিধায়ক এবং রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘দিনে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত শুল্ক আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’’ বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ডিসিআর দুর্নীতির উল্লেখ করে মাসে ১০০ কোটি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রেখেছেন। জগন্নাথের দাবি, বিগত সরকারের আমলে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকার ডিসিআর দুর্নীতি হয়েছে।
ঘেরাটোপে ‘পাথরসম্রাট’
বুধবার টুলুর আত্মীয়ের বাড়ি তল্লাশি চলাকালীন উদ্ধার হওয়া টাকা এবং সোনার ছবি এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী টুলুকে ‘বালি মাফিয়া’ বলেছেন। কারণ, পাথরের পাশাপাশি বালির ব্যবসাও ছিল টুলুর। গরুপাচার মামলায় অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পরে টুলুর নামও ভেসে উঠেছিল। তবে সিবিআই আধিকারিকদের ইঙ্গিত, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে সে যাত্রা রেহাই পান টুলু। তখনও পর্যন্ত টুলু ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিন মণ্ডল স্টোন প্রোডাক্টস্ প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থার ডিরেক্টর। অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পরে, স্ত্রী এবং মেয়েকে ডিরেক্টর করে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে আরও চারটি নতুন কোম্পানি খোলেন তিনি। সিবিআই বা ইডির মতো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা, যারা আগে টুলুকে নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান করেছিল, তাদের মতে, বিভিন্ন কোম্পানি খুলে বিপুল বেআইনি অর্থ সরাতে থাকেন টুলু।
সরকার বদলের পর চাপ বাড়তে থাকে টুলুর উপর। ২৩ মে মহম্মদবাজার থানায় দুর্গাপুরের রাজু মণ্ডল নামে এক ব্যবসায়ী টুলুর বিরুদ্ধে লরি আটকে রাখার অভিযোগ দায়ের করেন। ৩ জুলাই তিনি ফের অভিযোগ করেন যে, টুলু তাঁকে অভিযোগ তুলে নিতে বলে হুমকি দিচ্ছেন। ঠিক তার পরের দিন ভূমিরাজস্ব দফতর টুলুর বিরুদ্ধে বেআইনি বালি পাচারের অভিযোগ দায়ের করে মহম্মদবাজার থানায়। উদ্ধার হয় ৩ লক্ষ কিউবিক ফুটের বেশি অবৈধ ভাবে তোলা বালি। সবটাই পাওয়া যায় টুলুর জমি থেকে। বুধবার রাজ্য পুলিশের তল্লাশির পর টুলু যে ফের ইডির মতো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থারও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠবেন, সেই ইঙ্গিত মিলেছে। আর টুলু থেকে শুরু করে তদন্তের শাখাপ্রশাখা আরও অনেক দূর যাবে বলেই ইঙ্গিত রাজ্য পুলিশের।