দুর্গাপুজোর পাস বিলি নিয়ে দুর্নীতি মামলায় রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন আগাম জামিন চেয়ে এ বার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন। কলকাতা হাই কোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। পুজোর মধ্যেই গ্রেফতার হতে পারেন আশঙ্কা করে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। আগামী সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ। তার পরে শীর্ষ আদালত খুললে এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
অভিযোগ, ইউনেস্কোর নাম ভাঙিয়ে চড়া দামে দুর্গাপুজোর টিকিট বিক্রি করতেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল। তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগে গত ৯ জুন বৌবাজার থানায় এফআইআর দায়ের হয়। তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তার পরেই হাই কোর্টে যান প্রাক্তন মন্ত্রী। গত ১৫ অক্টোবর বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ ইন্দ্রনীলের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়।
ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে এফআইআরে অভিযোগ করা হয়েছে, মাস আর্ট নামে একটি সংস্থার সঙ্গে ইউনেস্কোর সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। রাজ্যে বিজেপি সরকারের দাবি, পূর্বতন সরকারের আমলে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের টেন্ডারের অর্থ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে অন্যত্র সরানো হয়েছিল। হাই কোর্টে রাজ্যের সওয়াল, ৫৩.৪৬ কোটি টাকার টেন্ডার জিআইডিআই ক্রিয়েশনকে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৫০.৩১ কোটি টাকা থার্ড লাইন ক্রিয়েশনকে দেওয়া হয়। রাজ্যের দাবি, মাস আর্ট-সহ কয়েকটি সংস্থার মাধ্যমে ইন্দ্রনীল ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগ থাকা অ্যাকাউন্টে অর্থ গিয়েছিল।
ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মাস আর্ট সোসাইটির পদাধিকারী ছিলেন। এই সংস্থার বিরুদ্ধে ইউনেস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার দাবি করে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের টিকিট বিক্রির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের টেন্ডার পাওয়া জিআইডিআই ক্রিয়েশন এবং থার্ড লাইন ক্রিয়েশনের সঙ্গে ইন্দ্রনীলের যোগসূত্র ছিল। এই দুই সংস্থার সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের প্রাথমিক উপাদান রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে আদালতও।
জিআইডিআই ক্রিয়েশনকে দেওয়া ৫৩.৪৬ কোটি টাকার টেন্ডারের অর্থের একটি অংশ থার্ড লাইন ক্রিয়েশন এবং মাস আর্টে গিয়েছিল। এ ছাড়া ইন্দ্রনীল, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টে অর্থ যাওয়ার অভিযোগও আদালতে জানানো হয়। আদালত জানায়, টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ইন্দ্রনীল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই অভিযোগের তদন্ত প্রয়োজন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, মন্ত্রী থাকাকালীন সরকারি পদের অপব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এই পর্যায়ে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আদালতের বক্তব্য, তদন্তের সময় নতুন কোনও অপরাধের তথ্য প্রকাশ্যে এলে তদন্তকারী সংস্থার তা খতিয়ে দেখা কর্তব্য। তদন্ত শুধু প্রাথমিক অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
আরও পড়ুন:
আদালত জানিয়েছে, ইন্দ্রনীলের সঙ্গে জিআইডিআই ক্রিয়েশন এবং থার্ড লাইন ক্রিয়েশনের যোগসূত্রের প্রাথমিক উপাদান রাজ্য দেখাতে পেরেছে। প্রাথমিক ভাবে প্রমাণিত মাস আর্ট সোসাইটির পদাধিকারীদের মধ্যে ইন্দ্রনীলের স্ত্রী এবং টেন্ডার পাওয়া সংস্থাগুলির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও ছিলেন।
এই মামলায় ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ইডিও। ইউনেস্কোর নাম ভাঙিয়ে দুর্গাপুজো কার্নিভালের ভিআইপি পাস বিক্রি (মাস আর্ট মামলা), চলচ্চিত্র উৎসব ও কলকাতা বইমেলায় আর্থিক তছরুপ এবং নিজের ঘনিষ্ঠ সংস্থাকে বেআইনি ভাবে টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে। প্রাথমিক তদন্তে ইডির অনুমান, ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। ইতিমধ্যেই দু’বার ইন্দ্রনীলকে সিজিও কমপ্লেক্সের দফতরে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ইডি। তার আগে ইন্দ্রনীলের কসবার বাড়ি এবং সিঙ্গুরের বাগানবাড়ি-সহ বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি।